বহুজাতিকের একাধিপত্য ভেঙে আইভরি কোস্টে দেশীয় প্রতিষ্ঠানের জয়যাত্রা

বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘদিনের আধিপত্য ভেঙে আইভরি কোস্টের জ্বালানি, অর্থায়ন ও প্রসাধন খাতে নিজেদের অবস্থান দৃঢ় করছে দেশটির স্থানীয় উদ্যোগগুলো। গভীর বাজার জ্ঞান, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং কৌশলগত বিনিয়োগের মাধ্যমে ‘পেট্রো আইভরি’, ‘জামো’ এবং ‘কায়রা হোল্ডিং’-এর মতো দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখন কেবল নিজেদের বাজারেই আধিপত্য বিস্তার করছে না, বরং আঞ্চলিক গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও পা রাখছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও স্থানীয় এই উদ্যোক্তাদের উত্থান আফ্রিকার উদীয়মান বাণিজ্যিক সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

বিজ্ঞাপন

জ্বালানি খাতে বহুজাতিক জায়ান্টগুলোর একচেটিয়া আধিপত্যের মুখে ১৯৯৪ সালে যাত্রা শুরু করেছিল স্থানীয় জ্বালানি পরিবেশক প্রতিষ্ঠান ‘পেট্রো আইভরি’। বর্তমানে বহুজাতিক টোটালএনার্জিস ও শেলের পরেই দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম এবং স্থানীয় মালিকানাধীন সর্ববৃহৎ জ্বালানি সরবরাহকারী হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে তারা। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী সেবাস্তিয়ান কাদিও-মরোক্রো কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে জানান, বহুজাতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় স্থানীয় মালিকানার কারণে তারা অনেক দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, যা তাদের বাজারের ১৫ শতাংশ শেয়ার নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করেছে। ২০০৭ সালে বিউটেন গ্যাস বাজারে প্রবেশ এবং বর্তমানে বৈদ্যুতিক যানবাহনের চার্জিং অবকাঠামোতে বিনিয়োগের মাধ্যমে তারা স্থানীয় বাজারে নিজেদের শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে।

আফ্রিকার আর্থিক খাতেও প্রথাগত ব্যাংকিং ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটাচ্ছে প্রযুক্তিভিত্তিক স্টার্টআপ ‘জামো’। ২০২০ সালে যাত্রা শুরু করা এই ডিজিটাল ব্যাংকিং প্ল্যাটফর্মটি বর্তমানে ২০ লাখেরও বেশি গ্রাহক এবং ১০ হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাকে সেবা দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির সহ-প্রতিষ্ঠাতা হাসান বুর্জি জানান, ফরাসি ভাষাভাষী পশ্চিম আফ্রিকায় প্রযুক্তি খাতের প্রসার নিয়ে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের সংশয় দূর করাই ছিল তাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ। মূলত জেনারেশন জেড বা তরুণ প্রজন্মকে লক্ষ্য করে গড়ে তোলা এই প্ল্যাটফর্মটি এখন বৈশ্বিক ভেঞ্চার ক্যাপিটালিস্টদের দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছে।

স্থানীয় উৎপাদন ব্যবস্থার সাফল্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে প্রসাধন সামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘কায়রা হোল্ডিং’। ২০০৯ সালে আবিদজানের একটি মাত্র দুই কক্ষের অ্যাপার্টমেন্টে মাত্র ৪ মিলিয়ন সিএফএ ফ্রাঙ্ক বা প্রায় ৭,০০০ ডলার পুঁজি নিয়ে সাবান উৎপাদন শুরু করেছিলেন উদ্যোক্তা ফোদ কায়রা ইয়াতাবারে। আজ সেই ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানটি আফ্রিকা, ইউরোপ ও মধ্যপ্রাচ্যের ৩২টি দেশে প্রসাধন ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্য রপ্তানি করছে। সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ সরবরাহ শৃঙ্খল বা ভার্টিক্যাল ইন্টিগ্রেশনের মাধ্যমে তারা উৎপাদন খরচ চীনের চেয়েও কমিয়ে এনেছে, যা বিশ্ববাজারে তাদের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়িয়েছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় এই ব্যবসার বিকাশ সহজ করতে আইভরি কোস্টের নিয়োগকর্তা সমিতি এবং আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংস্থা (আইএফসি) যৌথভাবে অর্থায়ন ও ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের জন্য কাজ করছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই উদ্যোগগুলো বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর বিদায় সংকেত নয়, বরং আফ্রিকান উদ্যোক্তাদের আত্মবিশ্বাস ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার সক্ষমতার পরিচায়ক। বিশ্ববাজারে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রেখে আফ্রিকার স্থানীয় ব্র্যান্ডগুলো এখন ‘আইভরি কোস্ট থেকে বিশ্বমঞ্চে’ নিজেদের গৌরবের জয়যাত্রা ঘোষণা করছে।

0%
0%
0%
0%