জন্মহার হ্রাসের মুখে জাপানে শিশুতোষ সামগ্রী নির্মাতাদের নতুন গন্তব্য পোষা প্রাণীর বাজার

জাপানে আশঙ্কাজনক হারে জন্মহার হ্রাস পাওয়ার বিপরীতে দ্রুত বিকাশ ঘটছে পোষা প্রাণীর বাজারের। এই জনমিতিক পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে দেশটির ঐতিহ্যবাহী শিশুতোষ সামগ্রী প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন তাদের ব্যবসায়িক মনোযোগ পোষা প্রাণীর বাজারের দিকে ঘুরিয়ে নিচ্ছে। পূর্বে যেসব প্রতিষ্ঠান শিশুদের জন্য ন্যাপি, ট্রলি বা বিশেষ বাহক (ক্যারিয়ার) তৈরি করত, তারা এখন কুকুর-বিড়ালের মতো পোষা প্রাণীর জন্য একই ধরনের বিশেষায়িত পণ্য তৈরি ও বিপণনে বড় ধরনের বিনিয়োগ করছে।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক বাজার গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইউরোমনিটরের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, জাপানে পোষা প্রাণীর যত্ন বা পরিচর্যা খাতের বাজার ২০২৫ সালের মধ্যে ৮৮০ বিলিয়ন ইয়েনে (প্রায় ৫.৪ বিলিয়ন ডলার) উন্নীত হয়েছে, যা ২০২০ সালে ছিল ৬৮৯.৬ বিলিয়ন ইয়েন (প্রায় ৪.২ বিলিয়ন ডলার)। বর্তমানে দেশটিতে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশুদের তুলনায় পোষা প্রাণীর সংখ্যা প্রায় ২ মিলিয়নেরও বেশি। মূলত সন্তানহীন দম্পতি এবং একাকীত্ব দূরীকরণে মানুষের পোষা প্রাণীর প্রতি নির্ভরতা বাড়ায় এই খাতের অভূতপূর্ব বাণিজ্যিক রূপান্তর ঘটছে।

১৯৩৪ সালে প্রতিষ্ঠিত জাপানের সবচেয়ে পুরোনো শিশু-বাহক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘লাকি ইন্ডাস্ট্রিজ’ এ রূপান্তরের একটি অন্যতম উদাহরণ। চার কোটিরও বেশি শিশু-বাহক প্রস্তুতকারী এই প্রতিষ্ঠানটি তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ২০২২ সালে কুকুরের জন্য বিশেষভাবে তৈরি হিপ ক্যারিয়ার বা ঝোলা ব্যাগ ‘নু-ই’ বাজারে আনে। প্রতিষ্ঠানটির বিক্রয় কর্মকর্তা শিন ওহতা জানান, নিজের পোষা কুকুরকে নিয়ে হাঁটার সময় ক্লান্ত হয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি শিশুদের মতো করে কুকুর বহনের এই অভিনব বাণিজ্যিক ধারণাটি লাভ করেন।

ব্যবসায়িক দিক থেকে শিশুদের বাজারের চেয়ে পোষা প্রাণীর বাজার অনেক বেশি লাভজনক হয়ে উঠছে। টোকিওভিত্তিক অন্যতম বৃহৎ ভোক্তা পণ্য প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ‘ইউনিচার্ম’ ২০০১ সাল থেকে পোষা প্রাণীর ডায়াপার ও অন্যান্য পণ্য উৎপাদন শুরু করে ব্যাপক সাফল্য অর্জন করেছে। প্রতিষ্ঠানটির ২০২৫ সালের আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, তাদের ব্যক্তিগত যত্ন খাতের মুনাফার হার যেখানে ১০.৭ শতাংশ, সেখানে পোষা প্রাণী যত্ন খাতের মুনাফার হার দাঁড়িয়েছে ১৫.৪ শতাংশে।

বিজ্ঞাপন

জাপানি সমাজে পোষা প্রাণীকে কেবল জীবজন্তু হিসেবে নয়, বরং পরিবারের সদস্য বা সন্তান হিসেবে বিবেচনা করার এই প্রবণতাকে সমাজবিজ্ঞানীরা ‘পেট হিউম্যানাইজেশন’ বা পোষা প্রাণীর মানবীকরণ হিসেবে অভিহিত করছেন। জার্মান ইনস্টিটিউট অব জাপান স্টাডিজের সমাজবিজ্ঞানী বারবারা হোলথুস কাতারভিত্তিক গণমাধ্যম আল জাজিরাকে জানান, শহুরে একাকীত্ব, বিবাহবিচ্ছেদ এবং পরিবারে শিশুর অনুপস্থিতির কারণে মানুষ এখন পোষা প্রাণীর মাঝে মানসিক সান্ত্বনা খুঁজছে। ফলে এয়ারবাগি ও সুইট মামির মতো জাপানের শীর্ষস্থানীয় অন্যান্য শিশুতোষ ব্র্যান্ডগুলোও এখন পোষা প্রাণীদের জন্য গাড়ি এবং বিশেষ পোশাক তৈরিতে মনোযোগ দিচ্ছে।

লাকি ইন্ডাস্ট্রিজের প্রধান নির্বাহী হিরোইউকি হিগিুচি এই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, অতীতে জাপানি পরিবারগুলো বড় ছিল এবং মায়েরা কাজের সুবিধার্থে শিশু-বাহক ব্যবহার করতেন। কিন্তু বর্তমানের একক পরিবার ও নিম্নমুখী জন্মহারের কারণে শিশুতোষ পণ্যের বাজারে নতুন উদ্ভাবনের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। ফলে টিকে থাকার স্বার্থে এবং অধিক মুনাফার আশায় জাপানি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন পোষা প্রাণীর বাজারকে একটি নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিচ্ছে।

0%
0%
0%
0%