সৃজনশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগের অভাব এবং বিনোদন খাতে আয়ের বড় বৈষম্য

দেশের শিল্প ও বিনোদন খাতের অর্থনৈতিক চিত্র নিয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) নতুন এক সমীক্ষায় সৃজনশীল সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রতি মানুষের আগ্রহ কমে যাওয়ার উদ্বেগজনক প্রবণতা উঠে এসেছে। নাট্যশালা, সিনেমা কিংবা সংগীতানুষ্ঠানের চেয়ে বর্তমানে সার্কাস ও ব্যান্ড শো’র মতো বিনোদনমূলক আয়োজনের প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও ব্যয় করার প্রবণতা বহুগুণ বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সার্কাস, ব্যান্ড শো এবং অর্কেস্ট্রার মতো আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ২২ কোটি টাকা আয় করলেও, গান, নাচ ও থিয়েটারের মতো সৃজনশীল লাইভ আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আয় ছিল মাত্র ৭ লাখ ৬২ হাজার টাকা।

বিজ্ঞাপন

শিল্প ও বিনোদন খাতের অর্থনৈতিক অবদান মূল্যায়নের লক্ষ্যে বিবিএস মোট ৩১৮টি প্রতিষ্ঠানের ওপর এই জরিপ পরিচালনা করে। বিবিএসের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) এই খাতের অবদান শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ, যার আর্থিক মূল্য ৫ হাজার ৩৪৩ কোটি টাকা। তবে সামগ্রিক জিডিপিতে এই খাতের অবদান সামান্য বৃদ্ধি পেলেও, সংগীত ও থিয়েটারের মতো সৃজনশীল খাতগুলো এখনো আর্থিক সংকটে ধুঁকছে। বিশেষায়িত এই ক্ষেত্রগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগের অভাবকেই এই দৈন্যদশার মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সৃজনশীল খাতের এই দুরবস্থার পেছনে বিনিয়োগের তীব্র সংকট এবং সরকারি-বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাবকে দায়ী করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সামিনা লুৎফা। তিনি বলেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও বড় অঙ্কের বিনিয়োগ ছাড়া এই খাত থেকে আর্থিক রিটার্ন আশা করা কঠিন। শিল্পীদের বড় অংশই বর্তমানে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। তবে এসব কর্মকাণ্ডের সামাজিক ও জাতিগত গুরুত্ব আর্থিক মূল্যের চেয়েও অনেক বেশি, যা সমাজ ও জাতি গঠনে অসামান্য ভূমিকা রাখে।

সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে, বিনোদন খাতের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত জাদুঘর ও ঐতিহাসিক স্থানগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে, যারা বছরজুড়ে ১৯ কোটি টাকারও বেশি আয় করে। চিড়িয়াখানা, উদ্ভিদ উদ্যান ও থিম পার্কগুলো ৪ কোটি টাকার বেশি আয় করলেও, সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো সরকারি ভর্তুকি ও সীমিত আয়ের ওপর নির্ভর করে টিকে আছে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট আয় ৫৫ কোটি টাকা হলেও, পরিচালন ব্যয় ছিল এর চেয়ে অনেক বেশি, যার একটি বড় অংশই কর্মীদের বেতন-ভাতায় ব্যয় হয়।

বিজ্ঞাপন

দেশীয় সংস্কৃতি বিকাশে বর্তমান সরকার সৃজনশীল অর্থনীতিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, সাংস্কৃতিক পর্যটন উন্নয়নের লক্ষ্যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারিভাবে ৩০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংকের সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) তহবিল থেকে আরও ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। থিয়েটার ও সংগীতের মতো খাতগুলোকে কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ উপখাত হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষায়িত অঞ্চল তৈরিরও উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

সাফল্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের ওপর জোর দিয়ে অধ্যাপক সামিনা লুৎফা মন্তব্য করেন, ভারত বা দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো দশকের পর দশক ধরে বিনিয়োগ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের সৃজনশীল অর্থনীতিকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বাংলাদেশকেও যদি বিশ্ববাজারে নিজের সংস্কৃতিকে তুলে ধরতে হয়, তবে সৃজনশীল খাতকে কেবল বিনোদন হিসেবে না দেখে একটি শিল্প হিসেবে বিবেচনা করে টেকসই নীতি ও বিনিয়োগের আওতায় আনতে হবে।

0%
0%
0%
0%