যুদ্ধের অভিঘাত কাটিয়ে পুনরায় স্বাভাবিক ছন্দে ফিরছে বৈশ্বিক নৌপরিবহন বাণিজ্য

ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধকে কেন্দ্র করে লোহিত সাগরে সৃষ্ট ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন খাতে এক নজিরবিহীন সংকটের জন্ম দিয়েছে। করোনা মহামারি ও ইউক্রেন সংকটের পর এটিই আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্যে সবচেয়ে বড় ধাক্কা হলেও খাতটির সহজাত স্থিতিস্থাপকতার কারণে এটি দ্রুত পূর্বাবস্থায় ফিরে আসবে বলে মনে করছেন অর্থনৈতিক বিশ্লেষকেরা। তাদের মতে, বৈশ্বিক অর্থনীতির জীবনরেখা হিসেবে পরিচিত এই খাতের মৌলিক কাঠামো শেষ পর্যন্ত প্রায় অপরিবর্তিতই থাকবে।

বিজ্ঞাপন

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষভাগ থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাতের জেরে আন্তর্জাতিক নৌপথগুলোতে চলাচলকারী জাহাজগুলো একের পর এক হামলা, দীর্ঘদিনের বিলম্ব এবং অস্বাভাবিক পরিচালন ব্যয়ের সম্মুখীন হয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই প্রতিকূলতা কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে শিপিং কোম্পানিগুলো। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ভবিষ্যতে কোম্পানিগুলো তাদের বাজেটে ঝুঁকির বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করবে এবং সরবরাহ শৃঙ্খল বহুমুখী করবে, তবে সামুদ্রিক বাণিজ্যের অপরিহার্যতার কারণে এই খাতের মৌলিক ধারা বজায় থাকবে।

বিশেষ করে কনটেইনার শিপিং খাতের ওপর এই যুদ্ধের প্রভাব তুলনামূলক কম। জ্বালানি তেল ও গ্যাস পরিবহনকারী ট্যাংকারগুলো যেখানে হরমুজ প্রণালীর ওপর গভীরভাবে নির্ভরশীল, সেখানে কৃষিপণ্য ও ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী বহনকারী কনটেইনার জাহাজগুলো লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের হামলা এড়াতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে বিকল্প রুট ব্যবহার করছে। গত ১৭ জুন ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে সংঘাত নিরসনে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার পর মেয়ারস্ক এবং হ্যাপাগ-লয়েডের মতো শীর্ষস্থানীয় বৈশ্বিক শিপিং জায়ান্টগুলো সুয়েজ খাল দিয়ে পুনরায় জাহাজ চলাচল শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে।

সংকটের তীব্রতা কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে এ খাতের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া অত্যন্ত দ্রুতগতির। ওশান অ্যান্ড এয়ার ফ্রেট মার্কেট অ্যানালিটিক্স প্ল্যাটফর্ম ‘জিনেটা’-এর তথ্য অনুযায়ী, জুনের মাঝামাঝিতে ওই অঞ্চলে কনটেইনার ধারণক্ষমতা ৩.২ মিলিয়ন টিইইউ (বিশ ফুট দৈর্ঘ্যের সমমানের কনটেইনার) থেকে হ্রাস পেয়ে মাত্র ৭৪,০০০ টিইইউ-তে নেমে এসেছিল। তবে বর্তমানে তা দ্রুত পুনরুদ্ধার হয়েছে এবং গত সপ্তাহে এশিয়া থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের রুটে ধারণক্ষমতা আগের সব রেকর্ড ভেঙে ৩৫০,০০০ টিইইউ-তে পৌঁছেছে।

বিজ্ঞাপন

এর আগেও বিভিন্ন বৈশ্বিক সংকটে এই খাতের অনন্য ঘুরে দাঁড়ানোর নজির দেখা গেছে। বাল্টিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম কাউন্সিল বা ‘বিমকো’-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সালে মহামারির প্রথম বছরে বৈশ্বিক কনটেইনার পরিবহন হ্রাস পেয়েছিল মাত্র ১.২ শতাংশ। এর বিপরীতে ২০২১ সালের জানুয়ারির মধ্যেই বিশ্বব্যাপী বন্দরগুলোর পণ্য হ্যান্ডলিং পূর্ববর্তী বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬.৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রাক-মহামারি পর্যায়কেও ছাড়িয়ে যায়, যেখানে বিমান চলাচল খাতের পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে চার বছরেরও বেশি সময় লেগেছিল।

বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ৯০ শতাংশই সম্পন্ন হয় সমুদ্রপথে, কারণ ধারণক্ষমতা ও সাশ্রয়ী ব্যয়ের দিক থেকে অন্য কোনো পরিবহন মাধ্যম এর সমকক্ষ নয়। বর্তমান বিশ্বের বৃহত্তম কনটেইনার জাহাজগুলোর ধারণক্ষমতা ২৪,০০০ টিইইউ-এরও বেশি, যা প্রায় ১২,০০০টি মালবাহী ট্রাক, ২,২৪০টি কার্গো বিমান অথবা ৩৬০টি মালবাহী ট্রেনের সমান মালামাল পরিবহনে সক্ষম। বিশাল পরিমাণের পণ্য পরিবহনে বিকল্প কোনো শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় সামুদ্রিক শিপিং বিশ্ব অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে।

সিঙ্গাপুর চেম্বার অব মেরিটাইম আরবিট্রেশনের সাবেক নির্বাহী পরিচালক এবং পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মেরিটাইম এনএক্সটি-এর প্রধান পুনিত ওঝা কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে জানান, আজ থেকে পাঁচ বছর পরও এই খাতটি তার চেনা রূপেই থাকবে কারণ এটি সম্পূর্ণরূপে চাহিদার ওপর নির্ভরশীল। জাহাজগুলো মালিকদের ইচ্ছায় চলে না, বরং বিশ্বজুড়ে ভোক্তাদের খাদ্যশস্য, আকরিক লোহা, গ্যাস কিংবা টেলিভিশনের প্রয়োজনেই এগুলো সাগরে ভাসানো হয়। তাই খবরের শিরোনাম বদলে গেলেও ভোক্তাদের চিরন্তন চাহিদাই শেষ পর্যন্ত এই খাতকে সচল রাখবে।

পরিবহন বুকিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ফ্রেইটোস-এর গবেষণা প্রধান জুদাহ লেভিনের মতে, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়েও দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দর এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও আমেরিকার প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে নিজের অবস্থান বজায় রাখবে। তবে সংকটকালীন সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ, খোর ফাক্কান এবং ওমানের পোর্ট সুলতান কাবুসের মতো অপেক্ষাকৃত ছোট বন্দরগুলোকে কাজে লাগিয়ে যেভাবে বিকল্প স্থল সংযোগ বা ল্যান্ড-ব্রিজ তৈরি করা হয়েছে, তা ভবিষ্যতে যেকোনো সংকট মোকাবিলায় নতুন পথ দেখাবে। তিনি মন্তব্য করেন, পানি যেমন বাধা পেলে তার নিজস্ব পথ খুঁজে নেয়, পণ্যবাহী কনটেইনারগুলোও ঠিক সেভাবেই যেকোনো পরিস্থিতিতে গন্তব্যে পৌঁছানোর উপায় বের করে নেয়।

সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এই সংকটের আরেকটি ইতিবাচক দিক হতে পারে। জাতিসংঘের সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল মেরিটাইম অর্গানাইজেশনের (আইএমও) দ্বিবার্ষিক সাধারণ সভায় নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আলোচনা করা হচ্ছে, যেখানে সংস্থাটির মহাসচিব আর্সেনিও ডোমিঙ্গোয়েজ নাবিকদের জীবনহানি রোধ এবং বৈশ্বিক খাদ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের ওপর জোর দিয়েছেন। থাইল্যান্ডের থাম্মাসাট বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক রুথ ব্যানোমিয়ং মনে করেন, দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা হলো কোনো একটি নির্দিষ্ট সংকীর্ণ জলপথের ওপর অতি-নির্ভরশীলতা হ্রাস করা এবং স্থল ও জলপথের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী লজিস্টিকস ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

0%
0%
0%
0%