পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি কৃষিখাতে ইসরায়েলি হামলা: ১০৩ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি ও গভীর অর্থনৈতিক সংকট

অধিকৃত পশ্চিম তীরের কৃষি খাতের ওপর ইসরায়েলি বাহিনী ও অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের পদ্ধতিগত আক্রমণ ফিলিস্তিনি কৃষকদের নিজস্ব ভূমি থেকে উচ্ছেদ করার পাশাপাশি দেশটির অর্থনীতিতে চরম বিপর্যয় ডেকে এনেছে। গত ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে পশ্চিম তীরে কঠোর সামরিক বিধিনিষেধ, জমি দখল এবং ফসল ধ্বংসের ফলে ফিলিস্তিনের কৃষি খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ১০৩ মিলিয়ন ডলারের বেশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। এই পরিকল্পিত আগ্রাসনের কারণে গ্রামীণ পরিবারগুলোর আয়ের প্রধান উৎস ধ্বংস হয়ে গেছে, যার ফলে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হওয়াসহ সামগ্রিক সরবরাহ শৃঙ্খলে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে হেব্রনের উত্তরের বেইত উমর গ্রামের বাসিন্দা ৫৮ বছর বয়সী আমাল স্লাইবির করুণ অভিজ্ঞতার কথা। তাঁর পরিবারের মালিকানাধীন ফলদ বাগানটি গত ২০২৫ সালের শেষের দিকে ইসরায়েলি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। অবৈধ ‘কারমেই জুর’ বসতির কাছাকাছি অবস্থান হওয়ার অজুহাতে তাদের জমি থেকে ৫০০ মিটার দূরত্বের মধ্যে প্রবেশ করতে নিষেধ করেছে ইসরায়েলি বাহিনী। অথচ ১২ সদস্যের এই স্লাইবি পরিবারের একমাত্র জীবিকা ছিল এই বাগান, যেখানে উৎপাদিত আঙুর ও অন্যান্য ফল থেকে প্রতি মৌসুমে অন্তত ১০,০০০ শেকেল বা প্রায় ৩,৩০০ ডলার আয় হতো।
ফিলিস্তিনি কৃষি মন্ত্রণালয় ২০২৫ সালের শুরুতে পশ্চিম তীরের কৃষি খাতে ইসরায়েলি সহিংসতা ও আগ্রাসনের অভূতপূর্ব বৃদ্ধির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, গ্রিনহাউস, কৃষি যন্ত্রপাতি ও গ্রামীণ সড়ক ধ্বংসের কারণে প্রায় ২.৫৭ মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে, তবে সামগ্রিক প্রত্যক্ষ অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ১০৩ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। এই ধ্বংসাত্মক অভিযানের কারণে কৃষিপণ্যের দাম বৃদ্ধি পেয়েছে, গ্রামীণ পরিবারগুলো চরম কর্মসংস্থান সংকটে পড়েছে এবং সার্বিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে।
এমন প্রতিকূলতার মধ্যেও মাসাফের ইয়াত্তার সুসিয়া গ্রামের কৃষক জিহাদ নাওয়াজাহ প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। ২০১০ সালে বসতি স্থাপনকারীরা বিষ প্রয়োগে তাঁর ভেড়ার পাল মেরে ফেলার পর তিনি জীবিকার তাগিদে মৌমাছি পালনে মনোযোগ দেন। কিন্তু ২০১৬ সালে বসতি স্থাপনকারীরা আবার হামলা চালিয়ে তাঁর ১০০টি মৌচাক ধ্বংস করে, যার আর্থিক ক্ষতি ছিল প্রায় ২০০,০০০ শেকেল বা ৬৭,০০০ ডলার। তবে পিছু হটে না গিয়ে তিনি তাঁর ঘরের কাছে নতুন করে মৌচাক স্থাপন করে জীবনসংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন। ফিলিস্তিনি কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, মৌমাছি পালন খাতে বসতি স্থাপনকারীদের হামলায় আনুমানিক ১৫৪,০০০ ডলারের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, যা ওই অঞ্চলের প্রাকৃতিক পরাগায়নেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বসতি স্থাপনকারীদের এই ধারাবাহিক সহিংসতা ফিলিস্তিনিদের অর্থনৈতিক অবস্থাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। এক সমীক্ষা অনুযায়ী, অধিকৃত পশ্চিম তীরে দারিদ্র্যের হার ২০২৩ সালের অক্টোবরের আগের ১২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ২৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। প্রায় ৭৮ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে যে তাদের মাসিক আয় মারাত্মকভাবে হ্রাস পেয়েছে এবং ৬০ শতাংশের বেশি পরিবার মৌলিক জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে। চরম অর্থনৈতিক মন্দার কারণে ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে পশ্চিম তীরে বেকারত্বের হার ৩০ শতাংশে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ।
বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ নাসর আবদেল করিম আল জাজিরাকে জানান, বসতি স্থাপনকারীদের বর্বর আচরণ এবং ইসরায়েলি সামরিক অবরোধই ফিলিস্তিনের অর্থনৈতিক স্থবিরতার মূল কারণ। কৃষকদের পণ্য পরিবহনের সুযোগ না থাকা এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিপণন নেটওয়ার্কের অভাবের কারণে সামগ্রিক কৃষিভিত্তিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ২০ শতাংশের বেশি সংকুচিত হয়েছে। সামগ্রিকভাবে গত দুই বছরে ফিলিস্তিনের জাতীয় অর্থনীতি ২৫ শতাংশ সংকুচিত হয়েছে, যা দেশটির সার্বিক উৎপাদন সক্ষমতাকে এক-চতুর্থাংশ কমিয়ে দিয়েছে।