ফক্সভাগেনের ব্যাপক পুনর্গঠন পরিকল্পনা: এক লাখ কর্মী ছাঁটাই ও চারটি কারখানা বন্ধের পথে জার্মান জায়ান্ট

গাড়িশিল্পের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন সংকটের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমূল পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে জার্মান অটোমোবাইল জায়ান্ট ফক্সভাগেন। তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিশ্ববাজারে চাহিদার মন্দার কারণে কোম্পানিটি তাদের জার্মানিতে অবস্থিত চারটি কারখানা বন্ধের পাশাপাশি প্রায় এক লাখ কর্মী ছাঁটাইয়ের এক মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এ বিশাল কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়িত হলে তা বৈশ্বিক মোটরগাড়ি শিল্পের ইতিহাসে অন্যতম বৃহত্তম পুনর্গঠন হিসেবে চিহ্নিত হবে।
চীনা গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রভাব, যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক নীতি এবং ইউরোপের বাজারে চাহিদা হ্রাসের ফলে ফক্সভাগেনের বর্তমান ব্যবসায়িক মডেলটি টেকসই থাকছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারকেরা। কোম্পানিটির প্রধান নির্বাহী অলিভার ব্লুমে এবং প্রধান অর্থ কর্মকর্তা আর্নো আন্টলিৎস ৮৯ বছর পুরোনো এই প্রতিষ্ঠানটিকে নতুন রূপ দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে আগামী পাঁচ বছরে কোম্পানিটি তাদের বিনিয়োগ ১৫ শতাংশ কমিয়ে ১৩০ বিলিয়ন ইউরোর নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।
প্রস্তাবিত পরিকল্পনা অনুযায়ী হ্যানোভার, জিভকাউ, এমডেন ও আউডির কারখানাগুলো বন্ধ হলে ৪৫ হাজারেরও বেশি কর্মী কর্মসংস্থান হারাবেন। এর আগে ঘোষিত ৫০ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মোট সংখ্যা এক লাখে পৌঁছাতে পারে। কোম্পানির এই কঠোর অবস্থানের বিপরীতে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছে শ্রমিক ইউনিয়ন ও লোয়ার স্যাক্সনি রাজ্য সরকার। ফক্সভাগেনের দ্বিতীয় বৃহত্তম শেয়ারহোল্ডার হিসেবে রাজ্য সরকার এবং শক্তিশালী ইউনিয়ন আইজি মেটাল এই ছাঁটাই প্রক্রিয়া রুখতে সর্বোচ্চ প্রতিরোধের ঘোষণা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বিওয়াইডি-এর মতো চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ি নির্মাতাদের উত্থানে ফক্সভাগেনের বাজার দখল সংকুচিত হয়ে আসছে। অ্যালিক্স পার্টনার্সের তথ্য অনুযায়ী, চীনে বিদেশি গাড়ি কোম্পানিগুলোর হিস্যা ২০২০ সালের ৫৭ শতাংশ থেকে নেমে ২০২৫ সালে ৩২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন চীনা বাজারে আধিপত্য বজায় রাখা ফক্সভাগেন এখন সেই বাজারে তৃতীয় স্থানে নেমে গেছে। পাশাপাশি ইউরোপের বাজারেও চীনা ব্র্যান্ডগুলোর অনুপ্রবেশ ফক্সভাগেনের জন্য নতুন উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত শুক্রবার শেয়ারবাজারে ফক্সভাগেনের শেয়ার দর ১৬ বছরের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মাঝে চরম উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ মনে করেন, কেবল ব্যয় সংকোচনই সমস্যার সমাধান নয়, বরং আকর্ষণীয় পণ্য উদ্ভাবন ও বাজারে চাহিদা তৈরিই দীর্ঘমেয়াদী টিকে থাকার মূলমন্ত্র। যদিও কোম্পানির মুখপাত্র নির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তবুও পুরো গ্রুপ ও এর ব্র্যান্ডগুলোর কাঠামোতে যে বড় ধরনের পরিবর্তনের হাওয়া বইছে, তা এখন প্রায় নিশ্চিত।