জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে ইলন মাস্কের ২০ বিলিয়ন ডলারের প্রকল্প রক্ষায় মার্কিন প্রশাসনের আইনি হস্তক্ষেপ

যুক্তরাষ্ট্রে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ উদ্যোক্তা ইলন মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘এক্সএআই’-এর মালিকানাধীন একটি মেগা ডেটা সেন্টারের পরিবেশগত প্রভাব সংক্রান্ত আইনি বিরোধে সরাসরি হস্তক্ষেপ করেছে মার্কিন সরকার। মিসিসিপিতে অবস্থিত ২০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের এই বৃহৎ প্রকল্পের কার্যক্রম বন্ধ করার যেকোনো প্রচেষ্টা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ বলে দাবি করেছে মার্কিন বিচার বিভাগ। সম্প্রতি আদালতে দায়ের করা এক আবেদনে বিচার বিভাগ পরিবেশ আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে এক্সএআই-এর বিরুদ্ধে দায়ের করা একটি মামলা সম্পূর্ণ খারিজ করার অনুরোধ জানিয়েছে।

বিজ্ঞাপন

আফ্রিকান-আমেরিকানদের অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত দেশটির বৃহত্তম নাগরিক অধিকার সংস্থা ‘ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর দ্য অ্যাডভান্সমেন্ট অব কালার্ড পিপল’ (এনএএসিপি) গত এপ্রিল মাসে ১৯৬৩ সালের ঐতিহাসিক ‘ক্লিন এয়ার অ্যাক্ট’-এর আওতায় এই মামলাটি দায়ের করে। মামলাটিতে অভিযোগ করা হয়েছে যে, এক্সএআই তাদের সাউথহ্যাভেন বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় পরিবেশগত ছাড়পত্র ছাড়াই অবৈধভাবে কয়েক ডজন প্রাকৃতিক গ্যাস চালিত টারবাইন পরিচালনা করছে। এর ফলে মিসিসিপি এবং পার্শ্ববর্তী টেনেসি অঙ্গরাজ্যের লাখ লাখ বাসিন্দা হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ এবং ক্যান্সারের মতো মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন।

গত সোমবার মার্কিন জেলা আদালতে দায়ের করা এক আবেদনে বিচার বিভাগ দাবি করেছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উদ্ভাবনী শক্তিকে সচল রাখতে প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করার চেষ্টা করে এনএএসিপি মূলত দেশের জাতীয়, অর্থনৈতিক এবং জ্বালানি নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে। এই ডেটা সেন্টার থেকে উৎপাদিত প্রযুক্তি মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় তথা পেন্টাগনের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক কার্যক্রম পরিচালনায় সরাসরি সহায়তা করছে। বিচার বিভাগের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ বিভাগের শীর্ষ কৌঁসুলি অ্যাডাম গুস্তাফসন এক বিবৃতিতে স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, কোনো বেসরকারি সংস্থা পরিবেশ আইনকে হাতিয়ার করে জাতীয় নিরাপত্তা ক্ষুণ্ন করবে, সরকার তা মুখ বুজে সহ্য করবে না।

মার্কিন সংবিধানে দেওয়ানি জরিমানা আদায় ও আইন প্রয়োগের চূড়ান্ত ক্ষমতা কেবল প্রশাসনের ওপরই ন্যস্ত করা হয়েছে বলে বিচার বিভাগের আবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে মামলার বাদীপক্ষের আইনি সহায়তাকারী পরিবেশবাদী গোষ্ঠী ‘আর্থজাস্টিস’ এই সরকারি হস্তক্ষেপকে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। সংস্থাটির প্রয়োগকারী বিভাগের পরিচালক লরা থমস এই পদক্ষেপকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনের একটি নজিরবিহীন ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা হিসেবে অভিহিত করে বলেন, ট্রাম্পের বিচার বিভাগ মূলত ইলন মাস্কের প্রতিষ্ঠানটিকে অবৈধ দূষণের দায় থেকে বাঁচাতে চাইছে, যার কোনো আইনি বা নৈতিক ভিত্তি নেই।

বিজ্ঞাপন

এনএএসিপির পরিবেশ ও জলবায়ু নীতি সংক্রান্ত পরিচালক আব্রে কোনার এক বিবৃতিতে বলেন, কোনোভাবেই কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যহানি ঘটিয়ে বৃহৎ কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানকে ছাড় দেওয়া যায় না। পরিবেশ সুরক্ষার এই মৌলিক অধিকার রক্ষায় তাদের আইনি লড়াই অব্যাহত থাকবে বলে তিনি ঘোষণা করেন। অন্যদিকে, স্পেসএক্সের সহযোগী প্রতিষ্ঠান এক্সএআই-এর পক্ষ থেকে এই আইনি বিরোধের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করা হয়নি।

বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তি ইলন মাস্কের সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ঘনিষ্ঠতা নতুন নয়, যেখানে মাস্ককে সরকারি ব্যয় সংকোচনের একটি বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া পেন্টাগনকে একটি সম্পূর্ণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন আধুনিক বাহিনীতে রূপান্তরের প্রক্রিয়ায় এক্সএআই-এর প্রধান মডেল ‘গ্রোক’ অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। সোমবারের আদালতের পিটিশনের সমর্থনে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে পেন্টাগনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক শীর্ষ কর্মকর্তা ক্যামেরন স্ট্যানলি জানান, ইরান ও ইসরায়েল যুদ্ধের প্রথম ৯৬ ঘণ্টার মধ্যে ২,০০০ লক্ষ্যবস্তুতে ২,০০০-এর বেশি যুদ্ধাস্ত্র নিক্ষেপের সামরিক পরিকল্পনায় ‘গ্রোক’ প্রযুক্তি সফলভাবে ব্যবহার করা হয়েছে।

পেন্টাগনের এই শীর্ষ কর্মকর্তা আরও সতর্ক করে বলেন, জ্বালানি সংকট বা কম্পিউটিং ক্ষমতার সীমাবদ্ধতার কারণে যদি ‘গ্রোক’ মডেলটির উন্নয়ন ও ব্যবহার ব্যাহত হয়, তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর একাধিক গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম ও রণকৌশল মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ফলে জাতীয় নিরাপত্তা এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতিতে মার্কিন সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখার স্বার্থে এই ২০ বিলিয়ন ডলারের ডেটা সেন্টারের নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছে ট্রাম্প প্রশাসন।

0%
0%
0%
0%