জাতীয় সংসদে সম্পূরক বাজেট নিয়ে তীব্র বিতর্ক ও অর্থমন্ত্রীর ২৩ হাজার ৬৫৫ কোটি টাকার মঞ্জুরি দাবি গ্রহণ

জাতীয় সংসদে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেট নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে সোমবারের এই অধিবেশনে অর্থ বিভাগের অনুকূলে ২৩ হাজার ৬৫৫ কোটি ৫৪ লাখ ৫ হাজার টাকার অতিরিক্ত বরাদ্দ মঞ্জুরির প্রস্তাব উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিরোধী সদস্যদের আনা ছাঁটাই প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ হওয়ার পর সরকারি দলের সমর্থনে এই দাবিটি অনুমোদিত হয়।
বাজেট আলোচনায় অর্থনীতিবিদ ও বিরোধী দলীয় সদস্যরা দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির নাজুক পরিস্থিতির চিত্র তুলে ধরেন। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা আলোচনায় অংশ নিয়ে বলেন, বর্তমানে জিডিপির প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে নেমে এসেছে এবং মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৫ শতাংশে অবস্থান করছে। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, দেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। এছাড়া ব্যাংক খাতে মূলধনের পর্যাপ্ততা ঋণাত্মক ২ দশমিক ৬৪ শতাংশে নেমে আসায় বিনিয়োগের পরিবেশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে।
রুমিন ফারহানা অভিযোগ করেন, গত ১৫ বছরে দেশ থেকে ২৩৪ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে এবং ব্যাংক খাতকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, শ্বেতপত্রের তথ্যানুযায়ী বড় অঙ্কের অর্থ পাচারের বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার কীভাবে ঘাটতি বাজেট বাস্তবায়ন করবে। এছাড়া আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের বর্তমান ঋণচুক্তি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকায় বিকল্প উৎসের উচ্চ সুদের ঋণ গ্রহণের ঝুঁকি সম্পর্কেও তিনি সরকারকে সতর্ক করেন।
ঢাকা-৪ আসনের সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীন ব্যাংক খাত থেকে সরকারের ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনাকে অবাস্তব বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, একদিকে সরকার ব্যাংক খাতকে রক্ষা করতে ৪০ হাজার কোটি টাকার পুনরুদ্ধার তহবিল গঠনের চিন্তা করছে, অন্যদিকে একই খাত থেকে বিপুল পরিমাণ ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে, যা চরম নীতিগত অসংগতি। তার মতে, সরকারি ঋণ গ্রহণের এই উচ্চ হার বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের প্রবাহকে মারাত্মকভাবে নিরুৎসাহিত করবে।
বাজেট ব্যবস্থাপনার সমালোচনা করে কুষ্টিয়া-২ আসনের সদস্য মো. আবদুল গফুর বলেন, সরকারি ব্যয়ে মিতব্যয়িতা ও নিয়ন্ত্রণের অভাবে অতিরিক্ত বরাদ্দের এই বোঝা তৈরি হয়েছে। অর্থবছরের শুরু থেকে আর্থিক শৃঙ্খলার অভাব থাকলে বাড়তি বরাদ্দের প্রয়োজন হতো না বলে তিনি উল্লেখ করেন। চট্টগ্রামের সদস্য শাহজাহান চৌধুরী পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনা, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির সুফল প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছানোর ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন।
অভিযোগের জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী দাবি করেন, সরকারের অগ্রাধিকারমূলক প্রকল্প ও জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যেই এই অতিরিক্ত বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। তিনি জানান, কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ ও সুদ মওকুফ এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপির গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের অর্থ সংস্থান নিশ্চিত করতেই এই অতিরিক্ত ব্যয় প্রয়োজন ছিল। অর্থমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রস্তাব যৌক্তিক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নিজস্ব কার্যক্রম পরিচালনায় কোনো বাড়তি বরাদ্দের প্রয়োজন হয়নি।