বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে এমসিসিআইর উদ্বেগ

২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সম্প্রসারণের একটি সাহসী উদ্যোগ হিসেবে স্বাগত জানিয়েছে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)। দেশের শীর্ষস্থানীয় এই ব্যবসায়ী সংগঠনটি ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এই বাজেটকে অর্থনীতি পুনর্গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে অভিহিত করলেও, উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
প্রস্তাবিত বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে এমসিসিআইর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে যে, ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা চলতি অর্থবছরের সংশোধিত লক্ষ্যের তুলনায় ১৮ দশমিক ২ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জন্য নির্ধারিত ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া অত্যন্ত দুরূহ হবে বলে সংগঠনটি মনে করছে।
বিনিয়োগের বর্তমান স্থবিরতা নিয়ে এমসিসিআই বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়েছে। গত অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ জিডিপির ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন। এর মধ্যে বেসরকারি বিনিয়োগের হার ২১ দশমিক ৫৩ শতাংশ এবং সরকারি বিনিয়োগ ৬ দশমিক ৪০ শতাংশে আটকে আছে। বিনিয়োগের এই নিম্নমুখী প্রবণতা কর্মসংস্থান সৃষ্টির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য বৃদ্ধির ঝুঁকি তৈরি করছে।
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) বাস্তবায়ন নিয়েও সংগঠনটি সংশয় প্রকাশ করেছে। ৩ লাখ কোটি টাকার এডিপি বরাদ্দ ইতিবাচক হলেও, অর্থবছরের প্রথম দশ মাসে বাস্তবায়ন হার মাত্র ৪১ দশমিক ৪১ শতাংশ হওয়ায় এর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। তবে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকার বরাদ্দ এবং ফ্যামিলি ও কৃষক কার্ড কর্মসূচির সম্প্রসারণকে এমসিসিআই অভ্যন্তরীণ চাহিদা সচল রাখার ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
কর প্রশাসন ও ব্যবসায়িক পরিবেশের ক্ষেত্রে এমসিসিআই কিছু ইতিবাচক পরিবর্তনের প্রশংসা করেছে। বিশেষ করে উৎস কর বিধানে পরিবর্তন, কর ট্রাইব্যুনাল ও আপিলে আগাম কর পরিশোধের হার কমানো এবং অনলাইনভিত্তিক করসেবা সম্প্রসারণের উদ্যোগকে তারা সাধুবাদ জানিয়েছে। তবে কোম্পানির ন্যূনতম টার্নওভার কর যৌক্তিকীকরণে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় সংগঠনটি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে, যা ব্যবসার নগদ প্রবাহ ও পুনঃবিনিয়োগ সক্ষমতাকে সীমিত করছে।
প্রস্তাবিত ডেটা কানেকটিভিটি বা তথ্যের আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থার বিষয়ে এমসিসিআই সতর্ক অবস্থান নিয়েছে। পর্যাপ্ত আইনি ও প্রযুক্তিগত সুরক্ষা নিশ্চিত না করে এই ব্যবস্থা কার্যকর করা হলে ব্যক্তিগত তথ্যের অপব্যবহার ও অননুমোদিত নজরদারির ঝুঁকি তৈরি হতে পারে বলে সংগঠনটি আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। তাই কর প্রশাসনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি করদাতার ব্যক্তিগত অধিকার ও জবাবদিহির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে তারা।
পরিশেষে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার কথা বিবেচনা করে এমসিসিআই প্রতি তিন মাস অন্তর বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সমন্বয় করার পরামর্শ দিয়েছে। তাদের মতে, বাজেটটির প্রকৃত সফলতা নির্ভর করবে প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন, কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং একটি হয়রানিমুক্ত ব্যবসা পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর। সরকারের সঙ্গে অংশীদারত্বের ভিত্তিতে একটি বিনিয়োগবান্ধব অর্থনীতি গড়ে তুলতে এমসিসিআই তাদের নিরবচ্ছিন্ন সহযোগিতা অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে।