জ্বালানি সংকট ও বিনিয়োগ খরায় স্থবির শিল্প খাত ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জে নতুন বাজেট

সাভারের লিটল স্টার স্পিনিং মিলস একটি রপ্তানিমুখী কারখানা হলেও গ্যাস সংকটের মারপ্যাঁচে এর উৎপাদন সক্ষমতা এখন ৬০ শতাংশে নেমে এসেছে। কারখানাটির জন্য অনুমোদিত গ্যাসের চাপ ১০ পিএসআই থাকলেও বাস্তবে মিলছে মাত্র দেড় থেকে দুই পিএসআই। এই জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষ সৌরবিদ্যুৎ ও ব্যাটারি প্রযুক্তিতে ১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও কাঙ্ক্ষিত সুফল পায়নি। লিটল স্টার গ্রুপের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলমের তথ্যমতে, গত চার বছরে শুধুমাত্র গ্যাস সংকটের কারণে তাদের উৎপাদন খাতে প্রায় আড়াই শ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
দেশের শিল্পখাতের এই চিত্র কেবল একটি কারখানার নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনীতির ভঙ্গুর অবস্থার প্রতিফলন। দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং বৈশ্বিক ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা বিরাজ করছে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাওয়ায় জিডিপির অনুপাতে বিনিয়োগের হার গত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমে এসেছে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিবর্তে শিল্পাঞ্চলে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা অর্থনীতির উদ্বেগজনক পরিস্থিতিরই জানান দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে, যা নতুন শিল্প বিনিয়োগ বা সম্প্রসারণে ভাটা পড়ার প্রমাণ। এছাড়া উচ্চ সুদহারের কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি আশঙ্কাজনক হারে কমে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এনপলি গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদের ভাষ্যমতে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কিছুটা স্থিতিশীলতা এলেও ব্যবসা এখনো স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ১৮ থেকে ২০ শতাংশ পিছিয়ে আছে, যা উদ্যোক্তাদের চলতি মূলধনের ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করছে।
এমন প্রেক্ষাপটে আগামী ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশ করবেন। ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের প্রত্যাশা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে সরকার আমদানিনির্ভর অগ্রিম আয়কর ও উৎসে করের হার যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনবে। বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বা বিডা ইতিমধ্যে ১৮০ দিনের একটি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যেখানে বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থাকে একীভূত করে সেবা সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা তহবিল শিল্পখাতকে পুনরুজ্জীবিত করতে ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
তবে বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শুধুমাত্র নীতিগত সহায়তা বা প্রণোদনা দিয়ে অর্থনীতিকে সচল করা সম্ভব নয়। পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ জোর দিয়ে বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ, কারণ এটি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমিয়ে চাহিদাকে সংকুচিত করছে। জ্বালানিসংকট নিরসনে নতুন গ্যাস কূপ খনন এবং সৌরবিদ্যুতের মতো বিকল্প উৎসের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। উদ্যোক্তাদের মতে, দেশি বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত না হওয়া পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করাও দুরূহ হবে।