AdvertisementAdvertisement

চাকরির বাজারে মন্দা মেটাতে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি কেনিয়ার তরুণদের ভাগ্য বদলাচ্ছে মোবাইল অ্যাপ

প্রাতিষ্ঠানিক চাকুরির তীব্র সংকটের মুখে কেনিয়ার তরুণ সমাজ প্রথাগত কৃষিকাজের সাথে আধুনিক মোবাইল অ্যাপ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) সমন্বয় ঘটিয়ে নিজেদের ভাগ্য বদল করছেন। দেশটির পশ্চিমাঞ্চলীয় কেরিজো কাউন্টির তরুণ উদ্যোক্তারা কৃষিকে কেবল জীবিকা নির্বাহের মাধ্যম হিসেবেই নেননি, বরং প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে একে একটি লাভজনক বাণিজ্যিক খাতে রূপান্তর করেছেন। ডিজিটাল দক্ষতা ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার এই মেলবন্ধন আফ্রিকার তরুণ প্রজন্মের সামনে স্বাবলম্বী হওয়ার এক নতুন অর্থনৈতিক দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

কেরিজো কাউন্টির কিবইতো গ্রামের বাসিন্দা ৩৩ বছর বয়সী দুই সন্তানের জননী চেপকোরির রটিচ এই কৃষি বিপ্লবের অন্যতম সফল উদাহরণ। এক দশকেরও বেশি সময় আগে উচ্চশিক্ষা শেষ করে যখন তিনি কর্মজীবনে প্রবেশের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তার স্বপ্ন ছিল একটি বহুজাতিক সংস্থায় ব্যবসায়িক প্রশাসক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়া। কিন্তু দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও একটি স্থায়ী চাকুরির দেখা না পেয়ে তিনি চুক্তিভিত্তিক কাজ শুরু করেন, যেখানে তার সর্বোচ্চ মাসিক আয় ছিল মাত্র ২০০ ডলার, যা রাজধানী নাইরোবিতে জীবনধারণের জন্য অত্যন্ত অপ্রতুল ছিল।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

চাকুরির আশা ছেড়ে দিয়ে রটিচ তার ভাড়া বাড়ির আঙিনাতেই কৃষিকাজ ও পশুপালন শুরু করেন, যা পরবর্তীতে তার আয়ের মূল উৎসে পরিণত হয়। রটিচের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে মাস শেষে বাড়িওয়ালাই উল্টো তার কাছ থেকে দুধ ও শাকসবজি কিনে ভাড়ার টাকা সমন্বয় করতেন। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) পরিসংখ্যান অনুযায়ী আফ্রিকার গড় কৃষকের বয়স ৬০ বছর হলেও, রটিচ এই তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করে বলেন যে তরুণদের সুযোগ এবং জমি দেওয়া হলে তারাই আধুনিক কৃষির মূল রূপকার হতে পারে।

কিবইতো থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে কাপ্তোরোই গ্রামের বাসিন্দা ৩২ বছর বয়সী জিওফ্রে কিপ্রপও একই ধরনের সাফল্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। ২০১৭ সালে তথ্য প্রযুক্তিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করার পরও কোনো স্থায়ী চাকুরির সুযোগ পাননি এই তরুণ। একসময় বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কম্পিউটার সিস্টেম রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে যেখানে তিনি সর্বোচ্চ ১৫,০০০ কেনিয়ান শিলিং (১১৬ ডলার) আয় করতেন, আজ সেখানে মিশ্র চাষাবাদ ও দুগ্ধ খামার থেকে দৈনিক প্রায় ৭,০০০ কেনিয়ান শিলিং (৫৪ ডলার) আয় করছেন।

Advertisement
বিজ্ঞাপন

নিজের প্রাতিষ্ঠানিক আইটি শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে কিপ্রপ কৃষিকাজে আধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করছেন। ফসলের রোগবালাই ও পুষ্টিহীনতা নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে তিনি ‘প্ল্যান্টিক্স’ নামক একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করেন, যা ফসলের পাতার ছবি বিশ্লেষণ করে তাৎক্ষণিক সমাধান দেয়। এছাড়া গুগলের কৃত্রিম উপগ্রহ প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘ভার্চুয়াল অ্যাগ্রোনমিস্ট’ অ্যাপের সাহায্যে তিনি মাটির পুষ্টি উপাদানের অভাব নির্ণয় করেন এবং ‘ডিজি কাউ’ অ্যাপের মাধ্যমে খামারের আয়-ব্যয় ও উৎপাদনের হিসাব রাখেন।

নাইরোবি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতিবিদ ডক্টর কিরিংগাই কামাউ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে জানান, তরুণরাই প্রযুক্তির সবচেয়ে ভালো ব্যবহারকারী, তাই কৃষিকে তাদের পূর্ণকালীন পেশা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে মুরাঙ্গা বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি বিশেষায়িত লার্নিং সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে, যা তরুণদের কৃষি ডাটা ইকোসিস্টেমের সাথে যুক্ত করবে। গ্লোবাল ওপেন ডাটা ফর এগ্রিকালচার অ্যান্ড নিউট্রিশন (গোডান)-এর কারিগরি প্রধান ডেরিক এনগিগি জানান, প্রযুক্তির ছোঁয়া এখন অনেক তরুণের জন্য কৃষিভিত্তিক কনটেন্ট তৈরির মাধ্যমে বিপুল রাজস্ব আয়ের পথও সুগম করেছে।

তবে এই সম্ভাবনাময় অগ্রযাত্রার পেছনে নানাবিধ চ্যালেঞ্জও রয়েছে বলে মনে করেন সফল উদ্যোক্তারা। রটিচ ও কিপ্রপ উভয়ের মতেই, কৃষিতে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো চরম ধৈর্য, একাগ্রতা ও ধারাবাহিকতা, যার অভাব অনেক তরুণকে শুরুতেই পিছিয়ে দেয়। তবে প্রতিকূলতা জয় করে প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি খাতে লেগে থাকতে থাকতে পারলে এটি কেবল বেকারত্ব দূর করবে না, বরং সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আনবে।

0%
0%
0%
0%