অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির মন্দা: ইউএসএমসিএ চুক্তি পুনঃআলোচনায় কোণঠাসা কানাডা

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য সংঘাতের জেরে নিজেদের অর্থনীতিকে বহুমুখী করার লক্ষ্যে চীনের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করছে কানাডা। উত্তর আমেরিকা অঞ্চলের শুল্কমুক্ত বাণিজ্য চুক্তি ‘ইউএসএমসিএ’ (ইউএস-মেক্সিকো-কানাডা এগ্রিমেন্ট) পুনর্নির্ধারণে ওয়াশিংটনের আগ্রাসী মনোভাব এবং মেক্সিকো সিটিতে চলমান আলোচনা থেকে ওটাভাকে বাদ দেওয়ার পর এই কৌশলগত পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে কানাডা। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্কনীতির কারণে কানাডীয় অর্থনীতিতে মন্দাভাব দেখা দেওয়ায় বেইজিংয়ের সাথে বাণিজ্য সম্প্রসারণের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ, ট্রাম্প প্রশাসন উত্তর আমেরিকায় তৈরি যানবাহনের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক যন্ত্রাংশের হার বাড়িয়ে ৮২ শতাংশ করার প্রস্তাব দিয়েছে, যার মধ্যে ৫০ শতাংশই উৎপাদিত হতে হবে যুক্তরাষ্ট্রে। মেক্সিকো সিটিতে চলমান বৈঠকে মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার মেক্সিকোর সাথে আলোচনার পর কানাডাকে এই প্রস্তাব মেনে নেওয়া বা ছেড়ে দেওয়ার চূড়ান্ত বার্তা দেবেন বলে অটোমোবাইল খাতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। এই কঠোর প্রস্তাবটি গৃহীত হলে তা ২০২০ সালে স্বাক্ষরিত মূল চুক্তির নীতি থেকে বড় ধরনের বিচ্যুতি ঘটাবে, যেখানে বর্তমানে ৭৫ শতাংশ আঞ্চলিক যন্ত্রাংশ থাকার নিয়ম রয়েছে।

মার্কিন শুল্কনীতির নেতিবাচক প্রভাবে গত কয়েক প্রান্তিক ধরে কানাডার অর্থনীতি ক্রমাগত সংকুচিত হচ্ছে। দেশটির সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা ‘স্ট্যাটিস্টিকস কানাডা’ জানিয়েছে, চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকে দেশটির মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) অপ্রত্যাশিতভাবে বার্ষিক শূন্য দশমিক ১ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা এর আগের প্রান্তিকে ছিল সংশোধিত ১ শতাংশ। অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের কানাডা বিষয়ক পরিচালক টনি স্টিলো সতর্ক করে বলেছেন, ইউএসএমসিএ চুক্তির সফল পুনর্নির্ধারণ, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের অবসান এবং হরমুজ প্রণালীতে স্বাভাবিক বাণিজ্য প্রবাহ নিশ্চিত হওয়ার ওপরই কানাডার অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমাতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি চীনের সাথে সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে বিশেষ মনোযোগ দিয়েছেন। দীর্ঘ এক দশক পর চীনের কোনো পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম কানাডা সফর উপলক্ষে ওটাভায় দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী অনিতা আনন্দের সাথে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই। বৈঠকে ওয়াং ই আশা প্রকাশ করেন, ২০৩০ সালের মধ্যে চীনে কানাডার রপ্তানি ৫০ শতাংশ বাড়ানোর যে লক্ষ্যমাত্রা ছিল, বর্তমান গতিশীলতা বজায় থাকলে তা দ্বিগুণ বা ১০০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব। এর আগে গত জানুয়ারিতে দুই দেশ বৈদ্যুতিক গাড়ির শুল্ক হ্রাসে একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষর করে।

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অংশীদারিত্ব বজায় রাখার পাশাপাশি নিজেদের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় বৈশ্বিক বাণিজ্যের বহুমুখীকরণের কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। নিউইয়র্কের ইকনোমিক ক্লাবে দেওয়া এক বক্তৃতায় তিনি মার্কিন নীতির পরোক্ষ সমালোচনা করে বলেন, বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই বৈরী পরিস্থিতিতে নিজেদের খাদ্য, জ্বালানি ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুরক্ষিত করতে না পারলে একটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে, আর সে কারণেই ওটাভা বিশ্বজুড়ে নতুন অংশীদার খুঁজছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%