নামাজে যাওয়ার পথে গুলিতে নিহত রাজশাহীতে নামাজে যাওয়ার পথে গুলিতে নিহত মোস্তফা; আগের বিরোধের জেরে হত্যার অভিযোগ

এশার নামাজ পড়তে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন মো. মোস্তফা (৫০)। অজু সেরে প্রতিদিনের মতোই পাশের মসজিদের দিকে হাঁটছিলেন তিনি। কিন্তু সেই চেনা পথই হয়ে উঠল তাঁর জীবনের শেষ যাত্রা। শনিবার রাত আটটার দিকে রাজশাহীর খোঁজাপুর গোরস্তানের পাশের সড়কে দুর্বৃত্তদের গুলিতে লুটিয়ে পড়েন এই শান্তস্বভাব মানুষটি। পরিবারের দাবি, আগের একটি বিরোধের জের ধরে পরিকল্পিতভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে—আর সেই হুমকির ইঙ্গিত নাকি দেওয়া হয়েছিল নির্বাচনের আগেই।
‘ওরা বলেছিল, আগে আমরা মারব, তারপর মীমাংসা হবে। ভোটের আগে একটা লাশ ফেলব, তারপর বিচার করব।’ ক্ষোভ আর কান্নাভেজা কণ্ঠে কথাগুলো বলছিলেন নিহত মোস্তফার ভাইয়ের মেয়ে শাকিলা খাতুন। তাঁর দাবি, দীর্ঘদিন ধরে হুমকি দিয়ে আসছিল প্রতিপক্ষের লোকজন। নির্বাচন শেষ হওয়ার পর শায়েস্তা করা হবে—এমন কথাও নাকি বারবার বলা হয়েছিল।
পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এশার নামাজ পড়তে পাশের একটি মসজিদে যাচ্ছিলেন মোস্তফা। এ সময় ওত পেতে থাকা দুর্বৃত্তরা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি করে পালিয়ে যায়। স্থানীয় একটি ময়দা মিলে কর্মচারী হিসেবে কাজ করতেন তিনি। তাঁর তিন মেয়ে। আড়াই মাস আগে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে এক মেয়ে মারা যায়। সেই শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই পরিবারটিতে নেমে এসেছে নতুন বিপর্যয়। এখন পুরো পরিবার শোক ও আতঙ্কে স্তব্ধ।
রোববার সকালে নিহত ব্যক্তির স্ত্রী নাদেরা বেগম বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন। মামলায় তিনজনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। নাম উল্লেখ করা আসামিরা হলেন স্থানীয় নহির উদ্দিনের ছেলে মো. উকিল, স্থানীয় বিএনপি নেতা মো. হাসিবুল মোল্লা ও শিহাবুল ইসলাম।
তাঁদের মধ্যে হাসিবুল ২৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের দাবি, উকিলকে নির্বাচনের পর রাজশাহী-২ আসনের সংসদ সদস্য মিজানুর রহমান মিনুকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানাতে দেখা গেছে এবং তিনি নির্বাচনী প্রচারেও সক্রিয় ছিলেন। শিহাবও বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে নিহতের পরিবার দাবি করেছে। ঘটনার পর থেকে অভিযুক্তরা পরিবারসহ বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছেন বলে জানা গেছে।
মামলার এজাহার ও স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় এক বছর আগে নিহত মোস্তফার ভাতিজা চঞ্চলকে কেন্দ্র করে একটি ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, চঞ্চল নেশাগ্রস্ত অবস্থায় খোঁজাপুর মোড়ের একটি দোকানে বসে থাকাকালে দোকানের কিছু মালামাল ভেঙে যায়। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে দোকানদারের পক্ষের লোকজন তাকে মারধর করেন। অভিযোগ আছে, উকিল, হাসিবুলসহ কয়েকজন ওই মারধরে অংশ নেন।
পরে চঞ্চলের স্বজনেরা ক্ষুব্ধ হয়ে উকিলকে মারধর করেন। এর জেরে উত্তেজনা আরও বাড়ে। একপর্যায়ে উকিল লোকজন নিয়ে চঞ্চলের বাড়ির দিকে হামলা চালাতে যান। সেদিন বাড়িতে গিয়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনায় মোস্তফার মাথায় গুরুতর আঘাত লাগে। তাঁর মাথায় ১০টি সেলাই দিতে হয়। পরে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে বাড়ি ফেরেন তিনি।
ঘটনাটি নিয়ে দুই পক্ষই মামলা করে, যা বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। নিহতের পরিবার জানায়, একাধিকবার মীমাংসার উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রতিপক্ষের পক্ষ থেকে বলা হয়, নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো সমঝোতা হবে না। সেই সময় থেকেই তারা হুমকি পেয়ে আসছিল বলে দাবি পরিবারের।
শাকিলা খাতুন বলেন, ‘আমার চাচাতো ভাইকে মারধরের প্রতিবাদ করতে গিয়ে চাচার মাথায় ১০টি সেলাই লেগেছিল। তখন এলাকার মুরব্বিরা বসে মীমাংসা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ওরা বলেছিল, নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিচার হবে না। ভোট শেষ হওয়ার পর এশার নামাজের সময় চাচাকে একা পেয়ে ওরা আক্রমণ করে। আগের ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। ওরা ছাড়া আমাদের কোনো প্রকাশ্য শত্রু নেই।’
নিহত মোস্তফার স্ত্রী নাদেরা বেগম বিলাপ করতে করতে বলেন, ‘আমার স্বামী খুব ভালো মানুষ ছিলেন। নিয়মিত নামাজ পড়তেন। অজু করে নামাজে যাওয়ার সময় এমন হলো কেন? তিনি তো কারও ক্ষতি করতেন না। ঘরে ফিরে এসে চা খেতে চাইতেন, বাইরে আড্ডা দিতেন না।’ অতীতের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘উকিল নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে একবার ঝামেলা হয়েছিল। তখন উনি ও তাঁর লোকজন মেরেছিল। আমি এ ঘটনার বিচার চাই, ফাঁসি চাই।’
নিহতের ভাতিজা মো. উজ্জ্বল আলী বলেন, ‘এলাকায় তাদের সঙ্গে মারামারি হওয়ার পর থেকেই তারা হুমকি দিচ্ছিল। বলত, ভোটের পর গুলি করে মেরে ফেলবে।’
রোববার সকালে মোস্তফার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিবেশী ও স্বজনদের ভিড়। কেউ সান্ত্বনা দিচ্ছেন, কেউ নীরবে চোখ মুছছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, মোস্তফা শান্ত ও নিরীহ স্বভাবের মানুষ ছিলেন। কেন তাঁকে টার্গেট করা হলো—এই প্রশ্ন এখন সবার মুখে।
স্থানীয় শিক্ষক আবদুল মতিন, যিনি নিহতের দুই মেয়েকে পড়াতেন, কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘ওনার দুই মেয়ে আমার ছাত্রী। খুব সহজ-সরল মানুষ ছিলেন। এমন মানুষকে হত্যা করা হলো—এটা মেনে নেওয়া কঠিন। এই পরিবার এখন কীভাবে চলবে? আমি ঘটনায় জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।’
নগরের মতিহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কালাম আজাদ বলেন, নিহতের স্ত্রী তিনজনকে আসামি করে মামলা করেছেন। ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
আসামিদের গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে। তিনি জানান, আগের একটি ঘটনার জেরে দুই পক্ষের মধ্যে মামলা ছিল। নতুন মামলায় নিহতের পরিবার দাবি করেছে, আগের ঘটনার আসামিরাই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। অভিযুক্তরা বর্তমানে পলাতক, তাঁদের গ্রেপ্তারে পুলিশ অভিযান অব্যাহত রেখেছে।