সীতাকুণ্ডে ১০ শ্রমিকের মৃত্যুতে সংকটের মুখে জাহাজভাঙা শিল্প

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে অবস্থিত ভাটিয়ারীর ফেরদৌস শিপইয়ার্ডে বিষাক্ত হাইড্রোজেন সালফাইড গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে ১০ জন শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় পুরো জাহাজভাঙা শিল্প এক গভীর সংকটের মুখে পড়েছে। গত ১৪ আগস্ট ‘এমটি রাশি’ নামক একটি জাহাজের ব্যালাস্ট ট্যাংকে কাজ করার সময় এই দুর্ঘটনা ঘটে। ট্যাংকের তলানিতে জমা পানি নিষ্কাশনের সময় বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিকরা শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত হন এবং পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১০ জনের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের জাহাজভাঙা শিল্পের ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ণ করেছে। হংকং কনভেনশন এবং আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক সংস্থার কঠোর পরিবেশগত ও শ্রমিক নিরাপত্তা মানদণ্ড বাস্তবায়নের যে বাধ্যবাধকতা রয়েছে, তা ফেরদৌস শিপইয়ার্ডের এই ঘটনায় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। প্রাথমিক সুরক্ষাব্যবস্থা, বিশেষ করে গ্যাস শনাক্তকরণ ও ভেন্টিলেশন প্রক্রিয়ায় ঘাটতির কারণে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের এই শিল্পটি ভারত বা তুরস্কের মতো প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
তৈরি পোশাক শিল্পের মতো জাহাজ ভাঙা শিল্পও বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও শ্রমিক অধিকার সংস্থাগুলোর কড়া নজরদারিতে রয়েছে। শিপব্রেকিং প্লাটফর্মের মতো সংস্থাগুলো একের পর এক দুর্ঘটনার কারণে শিল্পের পরিবেশ নিয়ে প্রশ্ন তুলছে, যা বিদেশি জাহাজ মালিকদের নিরুৎসাহিত করতে পারে। শিল্পসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা পুরো খাত বন্ধের কারণ হওয়া উচিত নয়, বরং নিরাপত্তার ঘাটতিগুলো চিহ্নিত করে দায়ীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।
বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আসলাম চৌধুরী এফসিএ মন্তব্য করেছেন যে, শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তাই এই শিল্পের টিকে থাকার প্রধান শর্ত। ফেরদৌস শিপইয়ার্ডের ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে মালিকপক্ষকে সমন্বিতভাবে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকেলিং অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিনিধিরাও আধুনিক গ্যাস ডিটেকটর, মানসম্মত সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন।
সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্প দেশের রড, স্টিল ও নির্মাণ খাতের প্রধান কাঁচামাল সরবরাহের অন্যতম উৎস হিসেবে কাজ করছে। এই শিল্পের সাথে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত বিপুল সংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থান এবং সরকারি রাজস্বের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে কঠোর নিরাপত্তা অডিট ও নিয়মিত গ্যাস টেস্টের দাবি উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয়রা এবং নিহতের পরিবারসহ সচেতন মহল দায়িত্বে অবহেলাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
