সুদহার অপরিবর্তিত রাখল ফেডারেল রিজার্ভ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সতর্ক অবস্থানে কেভিন ওয়ার্শ

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আনার দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্যমাত্রা বজায় রেখে টানা পঞ্চমবারের মতো নীতি সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ। বুধবার ব্যাংকটির পক্ষ থেকে সুদের হার ৩.৫ শতাংশ থেকে ৩.৭৫ শতাংশের মধ্যে বহাল রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। বিবিসি ও রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, জীবনযাত্রার ব্যয় রাতারাতি কমিয়ে আনার কোনো ‘জাদুর কাঠি’ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে নেই এবং মূল্যস্ফীতি স্বাভাবিক পর্যায়ে ফিরিয়ে আনতে আরও সময় প্রয়োজন।
ফেডারেল রিজার্ভের এই সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কমিটির সদস্যদের মধ্যে ভিন্নমত থাকলেও সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামতের ভিত্তিতে সুদের হার স্থিতিশীল রাখার পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নয়জন নীতিনির্ধারক সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার পক্ষে ভোট দিয়েছেন, যেখানে তিন সদস্য সুদের হার সামান্য বৃদ্ধির পক্ষে মত দিয়েছিলেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তাতে আগামী দিনগুলোতে মূল্যস্ফীতির চাপ পুনরায় বাড়তে পারে বলে সংস্থাটি সতর্কবার্তা দিয়েছে। এর প্রভাব ইতোমধ্যেই দৃশ্যমান হয়েছে, যেখানে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৬ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৯ ডলার অতিক্রম করেছে।
ফেডারেল রিজার্ভের বর্তমান চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই মার্কিন অর্থনীতির নীতিনির্ধারণে নতুন ধারার সূচনা করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, মূল্যস্ফীতি হ্রাসের বিষয়ে ফেডারেল রিজার্ভ তার প্রতিশ্রুতি থেকে বিচ্যুত হয়নি, যদিও গত পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতির হার ২ শতাংশের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে উঁচুতে অবস্থান করছে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা বজায় রাখা এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে খোলামেলা বিতর্কের সংস্কৃতিকে তিনি প্রাধান্য দিচ্ছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক নিয়োগ পাওয়া এই চেয়ারম্যানের ওপর একদিকে যেমন অর্থনীতির গতি ফেরানোর চাপ রয়েছে, অন্যদিকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এড়িয়ে চলার চ্যালেঞ্জও তার সামনে বিদ্যমান।
ফেডারেল রিজার্ভের এই ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। এসঅ্যান্ডপি ৫০০ সূচক গত এক মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে এবং প্রযুক্তি খাতের শেয়ারগুলোতেও বড় ধরনের দরপতন দেখা গেছে। বিনিয়োগকারী ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ এবং মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার ফলে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা আগামী কয়েক মাসে মার্কিন অর্থনীতির জন্য বড় ঝুঁকির কারণ হতে পারে। চার্লস শোয়াব ইউকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিচার্ড ফ্লিন সতর্ক করে বলেছেন যে, ইরানের সংঘাত ভবিষ্যতে সুদের হার নির্ধারণের ক্ষেত্রে বড় নিয়ামক হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে ফেডারেল রিজার্ভের সিদ্ধান্তের গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের বড় অংশই মার্কিন ডলারে সম্পন্ন হয়। নীতি সুদের হার বেশি থাকা মানে বিশ্বজুড়ে ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়া এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রবাহ কমে আসা। যদিও সুদের হার না বাড়ানোর অর্থ হলো আপাতত বিশ্ববাজারে ডলারের তারল্য সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি কম, তবুও অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য যে গতিশীলতা প্রয়োজন, তা এখনো অনুপস্থিত। বর্তমান পরিস্থিতিতে উন্নয়নশীল বিশ্বকে প্রবৃদ্ধির পালে হাওয়া পেতে দীর্ঘ অপেক্ষার প্রহর গুনতে হতে পারে।
