কাশ্মীরে নিখোঁজ ব্যক্তির মৃত্যু নিশ্চিত করল আদালত, ২৯ বছর পর ন্যায়বিচারের আশায় পরিবার

দীর্ঘ প্রায় তিন দশকের আইনি লড়াই ও অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে বিচারিক স্বীকৃতি পেল কাশ্মীরের ব্যবসায়ী আব্দুল রশিদ ওয়ানির মৃত্যু। ভারতের শাসনাধীন কাশ্মীরের এক আদালত গত এপ্রিল মাসে ওয়ানিকে মৃত ঘোষণা করে তার পরিবারের দাবির সত্যতা নিশ্চিত করেছে। ১৯৯৭ সালের জুলাই মাসে সামরিক হেফাজতে থাকা অবস্থায় নিখোঁজ হন কাঠ ব্যবসায়ী ওয়ানি। এটি কাশ্মীরে গুম হওয়া কয়েক হাজার মানুষের ক্ষেত্রে এক বিরল রায়, যা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচারের পথে একটি বড় পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদালত তার আদেশে ওয়ানির মৃত্যুসনদ প্রদানের পাশাপাশি পুলিশি তদন্তের তথ্যও আমলে নিয়েছে। তদন্তে উঠে এসেছে, ঘটনার দিন এক সেনা কর্মকর্তা ওয়ানিকে হেফাজতে নিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে তাকে হত্যা করে মরদেহ গুম করা হয়। যদিও রায়ে মৃত্যুর তারিখ নিশ্চিত করা হয়েছে, তবে তার মরদেহ কোথায় আছে সে বিষয়ে কোনো তথ্য মেলেনি। জুনায়েদ রশিদ, যিনি মাত্র পাঁচ বছর বয়সে বাবাকে হারিয়েছিলেন, তিনি বলেন, ২৯ বছর পর সরকার স্বীকার করল যে এমন নৃশংসতা চালানো হয়েছিল।

কাশ্মীরে নিখোঁজ ব্যক্তিদের স্বজনরা এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে জীবন অতিবাহিত করেন। নিখোঁজ স্বামীদের স্ত্রীদের সেখানে ‘অর্ধ-বিধবা’ বলা হয়, যারা প্রিয়জনের মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়ায় পুরোপুরি শোক পালন করতে পারেন না। জুনায়েদের ভাষ্যমতে, এই বিচার যদি অনেক আগেই পাওয়া যেত, তবে তাদের জীবনধারা এবং তার মায়ের স্বাস্থ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। ১৯৮৯ সালে কাশ্মীরে সশস্ত্র বিদ্রোহ শুরুর পর থেকে অঞ্চলটি বিশ্বের অন্যতম সামরিকায়িত এলাকায় পরিণত হয়, যেখানে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন।

মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব প্যারেন্টস অব ডিসঅ্যাপিয়ার্ড পারসনস (এপিজিপি)-এর তথ্যমতে, এই অঞ্চলে প্রায় ৮ হাজার মানুষ গুম হয়েছেন। ২০০৯ সালে সীমান্ত সংলগ্ন পাহাড়ি অঞ্চলে ২ হাজার ৭০০টি অজ্ঞাত কবর শনাক্ত করার পর থেকে গুমের ঘটনা নতুন করে আলোচনায় আসে। স্থানীয়রা দাবি করেন, নিরাপত্তা বাহিনী বহু মানুষকে হত্যার পর পরিচয়হীন অবস্থায় মাটিচাপা দিয়েছিল। যদিও ভারত সরকার বরাবরই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছে এবং দাবি করেছে যে নিহতরা বিদ্রোহী অথবা তারা পাকিস্তানে পালিয়ে গেছে।

বিজ্ঞাপন

বিচারিক এই রায়ের গুরুত্ব তুলে ধরে নতুন দিল্লির পিপলস ইউনিয়ন ফর ডেমোক্রেটিক রাইটস জানিয়েছে, ওয়ানির ঘটনাটি ১৯৮৯ সাল থেকে কাশ্মীরে চলমান মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি প্রতীকী দলিল। জুনায়েদ রশিদ ও তার পরিবার এই সত্য উদ্ঘাটনের জন্য বসতভিটা বিক্রি করে আইনি লড়াই চালিয়ে গেছেন। এমনকি তাদেরকে মামলার পথ থেকে সরাতে সামরিক কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে প্রলোভন ও ভয়ভীতি দেখানো হয়েছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

কাশ্মীরের মানবাধিকার কমিশন ২০১১ সালে গুম হওয়া ব্যক্তিদের সন্ধানে ডিএনএ পরীক্ষার সুপারিশ করেছিল, কিন্তু ২০১৯ সালে কমিশনের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়। বর্তমানে বহু পরিবার ন্যায়বিচারের আশায় কেবল প্রমাণের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। জান বেগম নামের এক নারী, যার স্বামী মনজুর আহমেদ দারকেও একইভাবে বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া হয়েছিল, তিনি বলেন, আসল ন্যায়বিচার তখনই হবে যখন তারা জানাবে যে আমার স্বামীর মরদেহের সঙ্গে তারা কী করেছে। এমন আরও অনেক পরিবার প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই নীরব যাতনা ও অবিচারের বোঝা বয়ে বেড়াচ্ছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%