অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে সংস্কার ও সমন্বিত উদ্যোগের অপেক্ষায় বাংলাদেশ

নতুন অর্থবছরটি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক সন্ধিক্ষণ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একদিকে সংসদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নতুন সরকারের যাত্রা, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতা—এই দুই বিপরীতমুখী বাস্তবতাকে সামনে রেখে দেশ আজ এক নতুন কর্মপরিকল্পনার অপেক্ষায়। স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে সরকার করকাঠামো সংস্কার ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টির যে অঙ্গীকার করেছে, তা বাস্তবায়নের এখনই উপযুক্ত সময়।

বিজ্ঞাপন

গত কয়েক বছর ধরে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করায় সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় হ্রাস পেয়েছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে বাজারে চাহিদার ওপর। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও জ্বালানি বাজারের অনিশ্চয়তা এবং বিনিময় হারের অস্থিরতা এখনো বড় ধরনের ঝুঁকি হিসেবে রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে বাজেটে নির্ধারিত ৬.৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মুদ্রানীতি ও রাজস্ব নীতির মধ্যে নিবিড় সমন্বয় অপরিহার্য। তবে প্রবৃদ্ধির চেয়ে বর্তমানে ক্ষুদ্র ব্যবসা, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি খাতে গতি ফেরানোকে সরকার অগ্রাধিকার দিলে তা দীর্ঘমেয়াদে সুফল বয়ে আনবে।

শুধুমাত্র করহার কমিয়ে বিনিয়োগ আকর্ষণ করা সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন বিদ্যুৎ ও জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং লাল ফিতার দৌরাত্ম্য নিরসন। বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নত করতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। শিল্পকারখানায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা না গেলে উৎপাদনশীল খাতে স্থবিরতা কাটানো কঠিন হয়ে পড়বে।

ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থা এবং ৩২ শতাংশ খেলাপি ঋণের বোঝা বর্তমান অর্থনীতির জন্য বড় উদ্বেগের কারণ। এই বিশাল খেলাপি ঋণের কার্যকর সমাধানে কঠোর রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও নীতিগত সংস্কার জরুরি। এছাড়া স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণের পথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্য সুবিধা হারানোসহ বৈশ্বিক শুল্ক ও কমপ্লায়েন্সের নতুন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারকে এখনই সুদূরপ্রসারী প্রস্তুতি নিতে হবে।

বিজ্ঞাপন

সবশেষে, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় এবং জবাবদিহিমূলক একটি সমন্বিত সংস্কার কর্মসূচিই পারে দেশের অর্থনীতিকে সংকট থেকে উত্তরণের পথে চালিত করতে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সঠিক নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারলে নতুন অর্থবছরটি বাংলাদেশের জন্য ঘুরে দাঁড়ানোর বছর হতে পারে। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ও স্বচ্ছতা বজায় রাখতে পারলে অচিরেই কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন সম্ভব।

0%
0%
0%
0%