তালেবান নীতির কারণে আফগানিস্তানে বিনিয়োগে আগ্রহ হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা: জাতিসংঘ

তালেবানের শাসনব্যবস্থা ও নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে আফগানিস্তানে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগকারীরা ক্রমেই আগ্রহ হারাচ্ছেন। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, দুর্বল অবকাঠামো এবং দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা আফগানিস্তানে বিনিয়োগের প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, দেশটির মাত্র ৬ শতাংশ মানুষের ব্যাংক হিসাব রয়েছে।
তালেবান কর্তৃপক্ষ বারবার দাবি করে আসছে যে আফগানিস্তানে বিনিয়োগের জন্য পরিবেশ অনুকূল। তবে জাতিসংঘের নতুন এই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাস্তবে তালেবান সরকার এখনো দেশীয় কিংবা বিদেশি কোনো বড় বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়নি। বরং তাদের বর্তমান নীতিগুলো সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে ব্যর্থ হয়েছে এবং দেশের অর্থনৈতিক সংকট আরও গভীর করেছে।
চরম সংকটে বেসরকারি খাত
প্রতিবেদনে বলা হয়, আফগানিস্তানের বেসরকারি খাত এখনো নানা জটিল সমস্যায় জর্জরিত। জটিল প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থায় সীমিত প্রবেশাধিকার, উচ্চ পরিবহন ব্যয়, দুর্বল অবকাঠামো—বিশেষ করে জ্বালানি খাতে—এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বেসরকারি খাতের বিকাশে বড় বাধা হয়ে আছে।
আফগানিস্তানের রপ্তানি কার্যক্রম মূলত পাকিস্তানের বন্দরগুলোর ওপর নির্ভরশীল। তবে তালেবান ও পাকিস্তানের মধ্যে রাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে সীমান্ত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আফগান ব্যবসায়ীরা বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
তালেবান কর্তৃপক্ষ বিকল্প রপ্তানি পথ খুঁজে বের করার প্রতিশ্রুতি দিলেও জাতিসংঘ বলছে, এই উদ্যোগ বাস্তবায়নে সময় লাগবে এবং নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হবে।
বিনিয়োগ সম্মেলনের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি
গত বছরের জানুয়ারি মাসে তালেবান কর্তৃপক্ষ আফগানিস্তানে বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে একটি সম্মেলনের আয়োজন করে। সেখানে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। তালেবানের অর্থনৈতিক দায়িত্বে থাকা শীর্ষ নেতা মোল্লা আবদুল গনি বরাদার বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
তবে এক বছর পার হয়ে গেলেও এসব ঘোষণার কোনো বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রশাসনিক জটিলতা ও ব্যাংকিং ব্যবস্থার দুরবস্থা
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি জানায়, বিনিয়োগকারীরা প্রশাসনিক জটিলতা, ব্যবসার অনুমোদন ও কর পরিশোধ সংক্রান্ত স্পষ্ট নির্দেশনার অভাব এবং আইনের খামখেয়ালি প্রয়োগে চরম হতাশায় ভুগছেন। এই পরিস্থিতি বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আফগানিস্তানের অন্যতম বড় সংকট হলো আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় খুব সীমিত প্রবেশাধিকার। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটি বৈশ্বিক ব্যাংকিং ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে অধিকাংশ লেনদেন হচ্ছে অনানুষ্ঠানিক পথে।
এই ব্যবস্থায় মানি এক্সচেঞ্জ ব্যবসায়ীরা অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। জাতিসংঘের হিসাবে, প্রতিবছর পাঁচ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি অর্থ অনানুষ্ঠানিক লেনদেন ব্যবস্থার মাধ্যমে ঘুরছে। একই সঙ্গে দেশে ব্যাংকিং সেবা ব্যবহারের সংস্কৃতি অত্যন্ত সীমিত—মাত্র ৬ শতাংশ মানুষের ব্যাংক হিসাব রয়েছে।
মোবাইল ব্যবহারে সম্ভাবনার আলো
তবে প্রতিবেদনে একটি আশাব্যঞ্জক দিকও তুলে ধরা হয়েছে। আফগানিস্তানের ৭০ শতাংশের বেশি মানুষের হাতে মোবাইল ফোন রয়েছে। জাতিসংঘের মতে, এটি আধুনিক আর্থিক সেবা ও ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার বিস্তারের জন্য একটি বড় সুযোগ তৈরি করতে পারে।
কিছু খাতে এখনো সম্ভাবনা রয়েছে
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আর্থিক অস্থিতিশীলতার কারণে বেসরকারি খাতের ভূমিকা দুর্বল হয়ে পড়েছে। তবে খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, পানীয় উৎপাদন এবং ধাতব শিল্পের মতো কিছু খাত তুলনামূলকভাবে ভালো করছে এবং এসব খাতে ভবিষ্যতে প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।
জাতিসংঘ আরও জানায়, ২০২১ সালের পর থেকে সরকার ও বেসরকারি খাতের মধ্যে যোগাযোগ ও সহযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। সংস্থাটির মতে, আফগানিস্তানের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে আইনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, আর্থিক সেবার প্রসার, দেশীয় উৎপাদন জোরদার করা এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
তথ্যসূত্র: আফগানিস্তান ইন্টারন্যাশনাল