মুমিনুলের ব্যাটে রানের ফোয়ারা: ফিরলেন নতুন রূপে

মুমিনুল হক, বাংলাদেশের ক্রিকেটের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, ঈদ উদযাপনের জন্য কক্সবাজারে পারিবারিক সফরে যাওয়ার আগে ক্রিকবাজে বিস্তারিত কথা বলেছেন নিজের ব্যাটিং দর্শন এবং মানসিকতার পরিবর্তন নিয়ে। বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যান জানিয়েছেন, ব্যক্তিগত ব্যাটিং কোচ এবং বাংলাদেশের প্রাক্তন প্রধান কোচ চন্দিকা হাথুরুসিংহের পরামর্শে তিনি ক্রিজে টিকে থাকার মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে রান করার মানসিকতা নিয়ে খেলছেন, যা তাঁর খেলার ধরনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মুমিনুল তাঁর বর্তমান ব্যাটিং উপভোগের কথা বলতে গিয়ে বলেন, “গত এক-দেড় বছর ধরে মনে হচ্ছে, যেন ছোটবেলায় টেপ-টেনিস ক্রিকেট খেলছি। যেমন করে পাড়া-মহল্লায় খেলা হতো, সেই একই আনন্দ এখন ফিরে পেয়েছি।” তিনি মনে করেন, ক্যারিয়ারের এই পর্যায়ে এসে তাঁর হারানোর বা প্রমাণ করার কিছুই নেই। এ কারণেই তিনি এখন চাপমুক্ত হয়ে খেলা উপভোগ করছেন। ব্যর্থতার চিন্তা না করে, খেলার আনন্দকেই তিনি বেশি গুরুত্ব দেন।
হাথুরসিংহে মুমিনুলের ‘ফ্লো’ বা ছন্দ নিয়ে কথা বলেছিলেন। এ বিষয়ে মুমিনুল ব্যাখ্যা করেন, “ছন্দ বলতে তিনি (হাথুরসিংহে) বোঝাতে চেয়েছেন খেলার ধরন বোঝা। প্রথম বল থেকেই ইনিংস কিভাবে শুরু করবেন, প্রথম ২০ বলে পরিস্থিতির সঙ্গে কিভাবে মানিয়ে নেবেন – যখন এই বিষয়গুলো জানা থাকে এবং একটি প্যাটার্ন তৈরি হয়, তখনই ছন্দ আসে।” তাঁর মতে, হাথুরসিংহে হয়তো বিশ্বাস করেন যে তিনি (মুমিনুল) সেই ছন্দ তৈরি করতে এবং ধরে রাখতে সক্ষম।
মুমিনুলের ব্যাটিং প্যাটার্ন প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে তিনি জানান, তাঁর সেঞ্চুরির ইনিংসে প্রথম ৩০ থেকে ৫০ রান দ্রুত আসতো, এরপর ৭০ পর্যন্ত কিছুটা ধীরগতিতে খেলতেন এবং পরে আবার গতি বাড়াতেন। আগে চার নম্বরে ব্যাটিং করার কারণে এমনটা হতো বলে মনে করেন তিনি। এখন তিন নম্বরে ব্যাটিং করে ওপেনারের মতো নতুন বলের সম্মুখীন হতে হয়, যা খেলার ধরণে পরিবর্তন এনেছে। তিনি বলেন, “নতুন বলে দ্রুত রান তোলা কঠিন, কারণ পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিতে হয়, সুইং এবং সিমের মোকাবেলা করতে হয়।”
ব্যাটিংয়ের নতুন দর্শনের কারণ হিসেবে তিনি হাথুরসিংহের সঙ্গে অস্ট্রেলিয়ার কাজ করার অভিজ্ঞতাকে তুলে ধরেন। তাঁর মতে, হাথুরসিংহের সঙ্গে কাজ করার পরই তাঁর মানসিকতার পরিবর্তন আসে। পূর্বে তিনি ক্রিজে টিকে থাকার কথা ভাবলেও, এখন তাঁর লক্ষ্য রান করা। এই পরিবর্তনের ফলে শরীরী ভাষা এবং শট খেলার ক্ষমতাও বেড়েছে বলে মনে করেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়ায় হাথুরসিংহের অধীনে তাঁর ট্রেনিং সেশন সম্পর্কে মুমিনুল জানান, সেখানে কোনো কারিগরি পরিবর্তন নয়, বরং মানসিকতার ওপরই জোর দেওয়া হয়েছিল। প্রায় ১২ থেকে ১৩টি সেশনে শুধু মানসিকতা নিয়েই কাজ করা হয়েছে – কিভাবে ইনিংস শুরু করবেন, কিভাবে এগিয়ে যাবেন এবং কখন ঝুঁকি নেবেন, এসবই ছিল আলোচনার মূল বিষয়।
মানসিকতার এই পরিবর্তনকে মাঠে প্রয়োগ করা কঠিন ছিল কিনা, এমন প্রশ্নের উত্তরে মুমিনুল বলেন, “শুধু মানসিকতা তৈরি করলেই হয় না, সেটার প্রয়োগের জন্য অনুশীলনও জরুরি।” তিনি এবং হাথুরসিংহে বিভিন্ন পরিস্থিতির ওপর ভিত্তি করে অনুশীলন করেছেন, যাতে চ্যালেঞ্জ এলে সেগুলো মোকাবেলা করা যায়। এই প্রক্রিয়ায় বিশ্বাসের গুরুত্বও অপরিসীম, বিশেষ করে যখন কোচ হাথুরসিংহের মতো কারো কাছ থেকে পরামর্শ আসে, যার ওপর মুমিনুলের পূর্ণ আস্থা রয়েছে।
শতরান না পাওয়া প্রসঙ্গে মুমিনুল বলেন, “শতকের চিন্তা না করে আমি বরং ভুলগুলো বিশ্লেষণ করি এবং সে মুহূর্তে কিভাবে খেলতে হবে, রান করার সুযোগ কোথায় বা বিপদ কোথায়, এসব নিয়ে ভাবা বেশি ভালো।” তাঁর মতে, ৪-৫ সেশন ধরে ব্যাটিং করার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত, কারণ সাধারণত ২-২.৫ সেশন খেলার পরেই তিনি আউট হয়ে যান। আরও এক সেশন ক্রিজে থাকতে পারলে শতরান করা সহজ হবে বলে তিনি মনে করেন।
ভবিষ্যতের অস্ট্রেলিয়া সফর সম্পর্কে মুমিনুল বলেন, “আমি আমার মানসিকতা এবং প্রস্তুতি নিয়ে যাব। ফলাফল কী হবে, তা আল্লাহ জানেন, তবে আমি আমার প্রক্রিয়া অনুযায়ী খেলব।” বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের সাম্প্রতিক উন্নতি এবং নিউজিল্যান্ডের মাটিতে জয়ের পর প্রত্যাশা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “অস্ট্রেলিয়া গেলেই সব ভেঙে পড়বে, এটা ভুল ধারণা।” তাঁর মতে, সবচেয়ে বড় অর্জন হলো বাংলাদেশের এখন পাঁচ দিন ধরে টেস্ট খেলার বিশ্বাস তৈরি হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে জয় নয়, তাঁদের মূল লক্ষ্য হলো পাঁচ দিন ধরে ভালো ক্রিকেট খেলা এবং দিনের পর দিন নিজেদের সেরাটা দিয়ে আধিপত্য বিস্তার করা।
