স্পেসএক্সের জমজমাট আইপিও-র জন্য আবেদন দাখিল: এলন মাস্ক

বুধবার উন্মোচিত প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) নথি দাখিল করেছে বেসরকারি মহাকাশ সংস্থা স্পেসএক্স। সফলভাবে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে প্রতিষ্ঠানটির বাজারমূল্য রেকর্ড ১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে, যা প্রতিষ্ঠাতা ইলন মাস্ককে ইতিহাসের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার হওয়ার পথে এগিয়ে দেবে। এই আইপিও মহাকাশ প্রযুক্তি বিপ্লব এবং মঙ্গল গ্রহে মানব বসতি স্থাপন ও মহাকাশে এআই ডেটা সেন্টার তৈরির মতো স্পেসএক্স-এর উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নতুন মাত্রা দেবে।
এই আইপিও আগামী মাসগুলোতে ওপেনএআই এবং অ্যানথ্রপিক-এর মতো প্রযুক্তি সংস্থাগুলোর বেশ কয়েকটি বড় মাপের আইপিও-এর পথ খুলে দিতে পারে। সফল হলে, স্পেসএক্স তাৎক্ষণিকভাবে বিশ্বের অন্যতম মূল্যবান পাবলিক ট্রেডেড কোম্পানি হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করবে। টেসলার পর ইলন মাস্কের বিশাল সাম্রাজ্যের এটি দ্বিতীয় কোম্পানি হবে, যার বাজারমূল্য ১ ট্রিলিয়ন ডলার অতিক্রম করবে।
২০০২ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে স্পেসএক্স স্টারলিংক ইন্টারনেট স্যাটেলাইটের হাজার হাজার উৎক্ষেপণ করে বিশ্বের বৃহত্তম মহাকাশ ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। গত বছর প্রতিষ্ঠানটির মোট ১৮.৬৭ বিলিয়ন ডলার আয়ের বেশিরভাগই এসেছে এর প্রায় ১০,০০০ স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক থেকে, যা ভোক্তা, সরকার এবং এন্টারপ্রাইজ গ্রাহকদের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সরবরাহ করে।
পুনরায় ব্যবহারযোগ্য রকেটের উদ্ভাবনী ব্যবহার মহাকাশ অর্থনীতির চিত্র পাল্টে দিয়েছে। এটি জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিনের মতো প্রতিযোগীদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, কারণ মহাকাশ বাণিজ্যিকীকরণের দৌড় তীব্র হয়েছে এবং বেসরকারি কোম্পানিগুলো উৎক্ষেপণ ব্যয় কমাতে, স্যাটেলাইট নেটওয়ার্ক স্থাপন করতে এবং সরকারি চুক্তি সুরক্ষিত করতে প্রতিযোগিতা করছে।
আইপিও নথি অনুযায়ী, স্পেসএক্স-এর ভবিষ্যতের বৃদ্ধির একটি বড় অংশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সম্পর্কিত ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল হলেও, এর নবীন এক্সএআই ইউনিট এখনও লাভজনক নয়। রকেট নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটির জন্য এই নিয়ন্ত্রণমূলক তথ্য প্রকাশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সপ্তাহে এসেছে, কারণ তারা তাদের পরবর্তী প্রজন্মের স্টারশিপ রকেটের একটি পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
চন্দ্র ও মঙ্গল অভিযান এবং স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবসা সম্প্রসারণের জন্য মাস্কের পরিকল্পনা এই নতুন রকেটের ওপর নির্ভরশীল। প্রাথমিকভাবে মঙ্গলবার এর পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণের সময় নির্ধারিত থাকলেও, সেটি এখন এই সপ্তাহের শেষের দিকে হওয়ার কথা রয়েছে।
বোর্ড মাস্ককে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ দিয়েছে, তবে তার বেশিরভাগ পারিশ্রমিক মঙ্গল গ্রহে একটি স্থায়ী মানব উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা এবং ১০০ টেরাওয়াট বা ১,০০,০০০ এক-গিগাওয়াট পারমাণবিক চুল্লির সমতুল্য কম্পিউট ক্ষমতা সম্পন্ন মহাকাশ ডেটা সেন্টার তৈরির মতো সাহসী লক্ষ্যের সাথে সংযুক্ত। বিশ্লেষক ও শিক্ষাবিদরা বলেছেন, স্পেসএক্স-এর অন্তর্নিহিত ব্যবসার মৌলিক ভিত্তির চেয়ে মাস্কের প্রধান নির্বাহী হিসেবে তারকা ব্যক্তিত্ব কিছু বিনিয়োগকারীর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে, কারণ এর মূল্যায়নের জন্য কোনো তুলনীয় কোম্পানি নেই।
কোম্পানিটি জানিয়েছে যে, তারা তাদের ব্যবসার সম্ভাব্য মোট বাজার ২৮.৫ ট্রিলিয়ন ডলার নির্ধারণ করেছে, যার বেশিরভাগ সম্ভাব্য রাজস্ব এআই-এর সাথে সম্পর্কিত। প্রথমবার জনসমক্ষে আসা এস-১ নিয়ন্ত্রক নথিতে এই পরিসংখ্যানগুলো দেখায় যে, স্পেসএক্স কীভাবে স্টারলিংক-চালিত রাজস্ব ভিত্তির ওপর নির্ভর করে, তবে বিশ্বাস করে যে এর দীর্ঘমেয়াদী সম্ভাবনা এআই এবং সম্পর্কিত অবকাঠামো কার্যক্রমের চারপাশে কেন্দ্রীভূত, যা বর্তমানে অলাভজনক।
১.৭৫ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যায়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হলে, এটি ২০১৯ সালে সৌদি আরামকোর আইপিওকে ছাড়িয়ে যাবে, যা রিয়াদের এক্সচেঞ্জে ১.৭ ট্রিলিয়ন ডলার মূল্যে তালিকাভুক্ত হয়ে বিশ্বের বৃহত্তম আইপিওর রেকর্ড গড়েছিল। রয়টার্স বার্তা সংস্থা এর আগে জানিয়েছিল, স্পেসএক্স এই অফারে ৭৫ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করার পরিকল্পনা করেছিল।
এই প্রস্তাবের বিশালতা মাস্কের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের ক্রমবর্ধমান আন্তঃসংযুক্ত কাঠামোর দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করেছে, যা প্রায়শই “মাস্কোনমি” নামে পরিচিত। এর মধ্যে রয়েছে শীর্ষস্থানীয় বৈদ্যুতিক গাড়ির কোম্পানি টেসলা, সেইসাথে তার এআই এবং ব্রেন-চিপ ইমপ্লান্টের ব্যবসা। স্পেসএক্স মাস্কের এক্সএআই-এর সাথে একীভূত হয়েছে এমন একটি চুক্তিতে, যেখানে রকেট কোম্পানির মূল্য ছিল ১ ট্রিলিয়ন ডলার এবং গ্রোক চ্যাটবটের ডেভেলপারটির মূল্য ছিল ২৫০ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্লেষকরা বলেছেন, মাস্কের একাধিক কোম্পানি পরিচালনার ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ, যার সম্মিলিত বাজারমূল্য ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, বিনিয়োগকারীদের মনোভাবের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। কোম্পানিটি ন্যাডস্যাক-এ ‘এসপিসিএক্স’ প্রতীক চিহ্নে তালিকাভুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। গোল্ডম্যান স্যাকস, মরগান স্ট্যানলি, ব্যাংক অফ আমেরিকা, সিটিগ্রুপ এবং জেপি মরগান এই আইপিওর বুকরানার হিসেবে কাজ করছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
