ওয়াশিংটন ডিসিতে ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের এক বছর: মিশ্র প্রতিক্রিয়ায় বিভক্ত জনমত

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক ন্যাশনাল গার্ড মোতায়েনের এক বছর পার হলেও শহরটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি ও এই সামরিক উপস্থিতির কার্যকারিতা নিয়ে জনমনে তীব্র মতভেদ রয়ে গেছে। অপরাধ দমনের লক্ষ্য নিয়ে ‘সেফ অ্যান্ড বিউটিফুল টাস্ক ফোর্স’-এর অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের আগস্ট মাসে হাজার হাজার সেনা সদস্যকে ডিসি শহরে মোতায়েন করা হয়েছিল। তবে এই দীর্ঘমেয়াদী সামরিক উপস্থিতি স্থানীয় বাসিন্দা, আইন বিশেষজ্ঞ এবং রাজনীতিবিদদের মধ্যে গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
এই মোতায়েনের বৈধতা নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন তুলেছেন ডিসির অ্যাটর্নি জেনারেল ব্রায়ান সোয়ালব। তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে দাবি করেছেন যে, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার কাজে সামরিক বাহিনীর এই ব্যবহার সংবিধানের পরিপন্থী। যদিও ডিস্ট্রিক্ট জজ জিয়া কব গত ২০ নভেম্বর এই মোতায়েন সমাপ্তির নির্দেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু আইনি লড়াই চলমান থাকায় আপিল আদালত পরবর্তীকালে প্রশাসনের অনুরোধে সেই আদেশের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়। এদিকে মেয়র মুরিয়েল বাউজারও স্থানীয় আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে ন্যাশনাল গার্ডের ব্যবহারের কড়া সমালোচনা করে আসছেন।
ন্যাশনাল গার্ডের উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে শহরজুড়ে বিক্ষোভও দানা বেঁধেছে। ‘ফ্রি ডিসি’ নামক একটি অ্যাডভোকেসি গোষ্ঠী এই মোতায়েনকে ‘বৈরী সামরিক দখলদারিত্ব’ হিসেবে আখ্যায়িত করে নিয়মিত প্রতিবাদ সমাবেশ করছে। অনেক বাসিন্দার মতে, এই বিপুল অর্থ সামাজিক কল্যাণমূলক খাতে ব্যয় করা হলে তা জনগণের প্রকৃত উপকারে আসত। যদিও কিছু নাগরিক সামরিক উপস্থিতির কারণে নিজেদের তুলনামূলক নিরাপদ বোধ করার কথা জানিয়েছেন, তবে নিস্কানেন সেন্টারের এক গবেষণায় দেখা গেছে যে, গত কয়েক বছর ধরে শহরটিতে সহিংস অপরাধ এমনিতেই নিম্নমুখী ছিল এবং গার্ডদের উপস্থিতির কারণে তাতে কোনো উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়েনি।
বিশ্লেষকদের দাবি, সহিংস অপরাধপ্রবণ এলাকাগুলোর পরিবর্তে ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যরা প্রধানত পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে টহল দিচ্ছে। অথচ আনাকোস্টিয়া নদীর পূর্বদিকের এলাকাগুলোতে যেখানে অপরাধের হার সবচেয়ে বেশি, সেখানে সেনাদের উপস্থিতি ছিল নগণ্য। এই মোতায়েনের ফলে স্থানীয়দের মাঝে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ওপর আস্থা কমে যাওয়া এবং সামরিক বাহিনীকে রাজনীতিকীকরণের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে মার্কিন সিনেটের একটি তদন্ত প্রতিবেদন।
আর্থিক ব্যয়ের দিক থেকেও এই মিশনটি বিশাল বোঝায় পরিণত হয়েছে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিষয়ক সিনেট কমিটির তথ্য অনুযায়ী, প্রথম বছরে এই মিশনের জন্য ব্যয় হয়েছে ৬০ কোটি ২০ লক্ষ ডলার। পেন্টাগন আগামী ২০২৯ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত এই কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করায় পরবর্তী সময়ে আরও ১.৪ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সব মিলিয়ে একদিকে নিরাপত্তার দাবি এবং অন্যদিকে নাগরিক অধিকার ও আইনি জটিলতার বেড়াজালে ওয়াশিংটন ডিসির এই বিতর্কিত সামরিক অধ্যায়টি এখন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
