মার্কিন কিশোর-কিশোরীদের ঘুমের ঘাটতি উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি, নতুন প্রতিবেদন

**কিশোর-কিশোরীদের ঘুমের উদ্বেগজনক অবনতি: নতুন গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য**

বিজ্ঞাপন

যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনস্বাস্থ্য স্কুল পরিচালিত এক নতুন গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। এতে দেখা গেছে, বর্তমান সময়ের কিশোর-কিশোরীরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক কম ঘুমাচ্ছে। ‘পেডিয়াট্রিকস’ জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণা অনুযায়ী, সকল বয়সের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেই ঘুমের ধারাবাহিক অবনতি লক্ষ্য করা গেছে। সর্বশেষ প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, প্রায় সকল গোষ্ঠীর মধ্যেই ঘুমের পরিমাণ রেকর্ড সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে; বিশেষ করে বয়ঃসন্ধির শেষ পর্যায়ে থাকা মাত্র ২২ শতাংশ কিশোর-কিশোরী রাতে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমানো সম্ভব বলে জানিয়েছে।

মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এবং গবেষণার প্রধান র্যাচেল উইডোমি বলেন, ‘কিশোর-কিশোরীদের ঘুমের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা বহু প্রজন্ম ধরে বিদ্যমান, যেমন বিদ্যালয়ের বাড়তি পড়াশোনা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের চাপ, বন্ধুদের সঙ্গে দীর্ঘ রাত পর্যন্ত জেগে থাকার সামাজিক প্রেশার এবং চাকরির ব্যস্ততা।’ তিনি আরও যোগ করেন, ‘তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন কিছু বিষয় যুক্ত হয়েছে, যেমন প্রতিনিয়ত হাতের মুঠোয় থাকা স্ক্রিন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক ব্যবহার। এছাড়াও, মহামারী, সামাজিক অস্থিরতা ও পুলিশি বর্বরতার মতো সাম্প্রতিক সময়ের সার্বজনীন চাপগুলোও ঘুমের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।’

গবেষণায় ঘুমের মানের বৈষম্যও স্পষ্ট হয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গ ও ল্যাটিনো কিশোর-কিশোরী এবং যাদের বাবা-মায়ের শিক্ষার স্তর নিম্ন, তাদের পর্যাপ্ত ঘুম পাওয়ার সম্ভাবনা অন্যান্য গোষ্ঠীর তুলনায় ক্রমশ কমছে। বয়ঃসন্ধির শেষ পর্যায়ের কিশোর-কিশোরীদের উপর এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। বয়স বাড়ার সাথে সাথে ঘুমের সময় ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে, এবং কৈশোরের শুরু থেকে শেষ পর্যায় পর্যন্ত ঘুমের সময়কাল ও পর্যাপ্ত বিশ্রামের অনুভূতি উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।

বিজ্ঞাপন

এই গবেষণার জন্য, গবেষকরা ‘মনিটরিং দ্য ফিউচার’ নামক একটি দীর্ঘমেয়াদী জাতীয় সমীক্ষার ডেটা বিশ্লেষণ করেছেন। ১৯৯১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের অষ্টম, দশম ও দ্বাদশ শ্রেণির ৪০ হাজারেরও বেশি শিক্ষার্থীর তথ্যের ভিত্তিতে এই সমীক্ষা পরিচালিত হয়। অংশগ্রহণকারীদের দুটি প্রধান প্রশ্নের উত্তর দিতে বলা হয়েছিল: তারা প্রতি রাতে অন্তত সাত ঘণ্টা ঘুমান কিনা এবং তারা পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাচ্ছেন বলে মনে করেন কিনা।

অপর্যাপ্ত ঘুম দৈনন্দিন অবসাদ ও কার্যকারিতা হ্রাসের কারণ হয়। এছাড়াও, এটি মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা, বিদ্যালয়ে খারাপ ফল এবং প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য জটিলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত।

স্ক্রিনের ব্যবহার বাড়াকে ঘুমের অভাবের প্রধান কারণ মনে করা হলেও, এর মূলে আরও গভীর সামাজিক বিচ্ছিন্নতা ও মানসিক অবসাদের অনুভূতি থাকতে পারে। ‘এইম আইডিয়াজ ল্যাব’ পরিচালিত সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যালিফোর্নিয়ার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ কিশোর-কিশোরী মানসিক অবসাদ ও উদ্বেগে ভুগছে। একই গবেষণা থেকে জানা যায়, প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিক্ষার্থী মনে করে, তারা সপ্তাহে মাত্র দুই দিন বা তার কম সময় ঘুম, খাওয়া ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধির মতো মৌলিক চাহিদাগুলো পূরণের জন্য সময় পায়।

‘এইম ইউথ মেন্টাল হেলথ’-এর নির্বাহী পরিচালক জোলি ডেলজা বলেন, অংশগ্রহণকারীরা এই পরিস্থিতিকে সরাসরি ‘অবিরাম একাডেমিক চাপের’ ফল বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ‘তারা ধীর হওয়ার এবং শান্ত মুহূর্তে, কেবল সংকটকালে নয়, শ্বাসপ্রশ্বাস ও মননশীলতার মতো কৌশলগুলো শেখার ও অনুশীলন করার সুযোগ চেয়েছেন।’ তিনি আরও জোর দেন যে, ‘বিদ্যালয় ও জনগোষ্ঠীর নতুন কোনো সমাধান উদ্ভাবনের প্রয়োজন নেই। শিক্ষার্থীদের প্রয়োজন হলো সেইসব মানুষ, কর্মকাণ্ড এবং সহায়ক উপকরণের জন্য আরও বেশি সময় ও পরিসর দেওয়া, যা তাদের মানসিক চাপ সামলাতে সাহায্য করে, যার মধ্যে পর্যাপ্ত ঘুমও অন্তর্ভুক্ত।’

বিভিন্ন গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, যারা তাদের সমবয়সীদের চেয়ে আগে ঘুমাতে যায় এবং বেশি সময় ধরে ঘুমায়, তাদের মানসিক দক্ষতা তীক্ষ্ণ হয় এবং তারা জ্ঞানীয় পরীক্ষায় ভালো ফল করে।

যদিও গবেষকরা কোনো একক জাতীয় সমাধানের কথা বলছেন না, তারা বৃহত্তর কাঠামোগত পদ্ধতির উপর জোর দিয়েছেন যা কিশোর-কিশোরীদের বড় অংশকে সাহায্য করতে পারে। তাদের একটি প্রস্তাবনা হলো, উচ্চ বিদ্যালয়ের ক্লাস শুরুর সময় সকাল ৮.৩০ বা তার পরে নির্ধারণ করা। উইডোমি বলেন, ‘খুব সকালে ক্লাস শুরু করা বয়ঃসন্ধিকালের প্রাকৃতিক জৈবিক ছন্দের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।’ তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ‘ঘুম-বঞ্চিত কিশোর-কিশোরীদের একটি প্রজন্ম অনিবার্য নয়। আমাদের একটি ‘ঘুম-সংস্কৃতি’ গ্রহণ করা উচিত, যেখানে ঘুমকে সত্যিই মূল্য দেওয়া হয় এবং যেখানে আমরা স্বাস্থ্যকর ঘুমের প্রচারের জন্য নীতি ও অন্যান্য হস্তক্ষেপ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হই।’

তথ্যসূত্র: দ্যা গার্ডিয়ান

0%
0%
0%
0%