নাইজেরিয়ায় মুসলিম গ্রামে ভয়াবহ হামলা: নিহত ১৬২, জঙ্গি দমনে নতুন সামরিক অভিযান ঘোষণা

নাইজেরিয়ার মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ গ্রামগুলোতে ভয়াবহ হামলার পর ইসলামি জঙ্গিদের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক অভিযান শুরু করার ঘোষণা দিয়েছে দেশটির সরকার। সর্বশেষ হামলায় অন্তত ১৬২ জন নিহত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই মুসলিম বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সময়ে, গত মাসে অপহৃত প্রায় ১৮০ জন খ্রিস্টানকে মুক্ত করা হয়েছে।
স্থানীয় কর্মকর্তারা জানান, মঙ্গলবার কাওয়ারা রাজ্যের ওরো ও নুকু গ্রামে সশস্ত্র হামলায় এই প্রাণহানি ঘটে। নিহতদের অনেকেই চরমপন্থী মতাদর্শ মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানানোয় টার্গেট হয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিচিত সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলগুলোর বাইরে এটি দেশটির অন্যতম ভয়াবহ হামলা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
হামলাকারীরা গ্রামগুলোতে ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং দোকানপাট লুট করে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল নাইজেরিয়ার দপ্তর একে “চরম নিরাপত্তা ব্যর্থতা” বলে মন্তব্য করেছে। এখনো কোনো গোষ্ঠী হামলার দায় স্বীকার না করলেও স্থানীয় বাসিন্দা ও কর্মকর্তারা বিভিন্ন ইসলামি জঙ্গি গোষ্ঠীর দিকে সন্দেহের আঙুল তুলেছেন।
নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্সি এক বিবৃতিতে জানায়, হামলাকারীরা গ্রামবাসীদের হত্যা করেছে কারণ তারা “চরমপন্থী ও সহিংস নয়—এমন ইসলাম চর্চা করার পথ বেছে নিয়েছিল এবং জোরপূর্বক মতাদর্শ চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা প্রত্যাখ্যান করেছিল।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কাওয়ারা রাজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে হামলা ও অপহরণের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এটি দ্রুত নতুন একটি জঙ্গি বিস্তার অঞ্চলে পরিণত হচ্ছে। ওয়াশিংটনভিত্তিক হাডসন ইনস্টিটিউটের গবেষক জেমস বারনেটের মতে, প্রচলিত ঘাঁটিগুলোতে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর চাপ বাড়ায় সশস্ত্র দলগুলো নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে।
অপহৃত ১৮৩ খ্রিস্টান মুক্ত
অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার কাদুনা রাজ্যের গভর্নর জানান, গত মাসে একযোগে তিনটি গির্জা থেকে অপহৃত সব ১৮৩ জন খ্রিস্টানকে মুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৮৯ জনকে বুধবার উদ্ধার করা হয়। মুক্তির বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানানো না হলেও বিশ্লেষকদের মতে, কিছু ক্ষেত্রে মুক্তিপণ পরিশোধ করা হয়ে থাকতে পারে।
গভর্নর উবা সানি বলেন, “এই ঘটনার পর আমি প্রেসিডেন্ট ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনা করেছি—বিশেষ করে রেজিনা এলাকা ঘিরে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে, যা দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত।”
‘অপারেশন সাভান্না শিল্ড’ শুরু
কাওয়ারা রাজ্যের গভর্নর আবদুলরাহমান আবদুলরাজাক জানান, সাম্প্রতিক সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের প্রতিক্রিয়ায় এই হামলা হতে পারে। স্থানীয় জনগণের দেওয়া গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে এসব অভিযান চালানো সম্ভব হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
নাইজেরিয়ার প্রেসিডেন্ট বোলা টিনুবুর দপ্তর জানায়, হামলার স্থান কাইয়ামা এলাকায় একটি সেনা ব্যাটালিয়ন মোতায়েন করা হবে। নতুন সামরিক কমান্ডের অধীনে ‘অপারেশন সাভান্না শিল্ড’ পরিচালিত হবে, যার লক্ষ্য “নিরস্ত্র ও অসহায় জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা দেওয়া।”
এর আগে গত নভেম্বর মাসে দেশজুড়ে ব্যাপক অপহরণের ঘটনায় নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট টিনুবু নিরাপত্তা খাতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন। পরিকল্পনার অংশ হিসেবে অতিরিক্ত পুলিশ নিয়োগ ও বনাঞ্চলে ফরেস্ট গার্ড মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা
বিশ্লেষকদের মতে, একাধিক অঞ্চলে একযোগে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে গিয়ে নাইজেরিয়ার সেনাবাহিনী চাপে রয়েছে। আধুনিক অস্ত্র ও উন্নত গোয়েন্দা সক্ষমতার ঘাটতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, নাইজেরিয়ায় জঙ্গিদের প্রধান লক্ষ্য খ্রিস্টানরা—যদিও এর পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি। বিশ্লেষকরা বলছেন, উত্তর নাইজেরিয়ায় হামলার শিকারদের বড় অংশই মুসলিম।
তবে নিরাপত্তা সহযোগিতার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র নাইজেরিয়ার কিছু অঞ্চলে ইসলামি জঙ্গিদের লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে। একই সঙ্গে, অল্পসংখ্যক মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা দেশটিতে অবস্থান করছেন।
ওয়াশিংটনে বৃহস্পতিবার দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প আবারও বলেন,
“ওরা খ্রিস্টানদের হত্যা করছিল, তাই আমরা নাইজেরিয়ায় তাদের কঠোরভাবে আঘাত করেছি।”