ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র হামলা, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা বেজে ওঠার শঙ্কা

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ভঙ্গুর শান্তি চুক্তি এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে। গত দুই দিনে ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক বিমান হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। রাজধানী তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে মার্কিন বাহিনীর ব্যাপক হামলায় এ পর্যন্ত অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) অন্তত একজন সদস্য রয়েছেন। এই সংঘাতের প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক সমুদ্রপথ হরমুজ প্রণালীর স্বাভাবিক কার্যক্রম প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে এবং বিশ্বজুড়ে নতুন করে অস্থিরতার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বুধবার ও বৃহস্পতিবার দুই দফায় চালানো এই হামলায় মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) প্রায় ১৭০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে বলে দাবি করেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরানও পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে বাহরাইন, কুয়েত এবং কাতারে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও অবকাঠামো লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে। তেহরানের পক্ষ থেকে সতর্ক করা হয়েছে, মার্কিন হামলা অব্যাহত থাকলে পুরো অঞ্চলজুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়বে। এই উত্তেজনার মধ্যেই ইরানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মার্কিন হামলায় ৭৮ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৪৭ জন এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

সংকটের সূত্রপাত হরমুজ প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের অধিকার ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে। ওয়াশিংটনের দাবি, ইরান ওই প্রণালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা চালিয়ে নৌ চলাচলের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করছে। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন এই দাবিকে ‘ভিত্তিহীন অজুহাত’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে জানিয়েছে, ওয়াশিংটন ইচ্ছাকৃতভাবে শান্তি চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন করছে। দেশটির পার্লামেন্ট স্পিকার মুহাম্মদ গালিবাফ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, হুমকি দিয়ে হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সম্ভব নয়।

তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় অনুষ্ঠিত ন্যাটো সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, জুন মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ এখন তার কাছে ‘অকার্যকর’। তবে পরবর্তী সময়ে তার সুর কিছুটা নমনীয় দেখা গেছে। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, কূটনৈতিক আলোচনার পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। যদিও বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষই একে অপরকে চুক্তির শর্ত ভঙ্গের দায়ে অভিযুক্ত করায় চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

আন্তর্জাতিক সমুদ্র সংস্থা বা আইএমও-এর তথ্যমতে, হরমুজ প্রণালীর আশেপাশে প্রায় ৬ হাজার নাবিক আটকা পড়েছেন। সংস্থাটির প্রধান আর্সেনিও ডমিঙ্গেজ এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বলে বর্ণনা করে নাবিকদের জীবনের নিরাপত্তার বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এদিকে, ইরানের বুশেহর প্রদেশে অবস্থিত পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের আশেপাশেও বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে বলে স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম মেহের নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে।

বিশ্লেষকদের অভিমত, সামরিক শক্তির মাধ্যমে ইরানকে নতজানু করার কৌশল সফল হচ্ছে না। ব্র্যাডফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতির অধ্যাপক আলাম সালেহ মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান উভয়ের জন্যই এখন ‘উইন-উইন’ বা উভয়পক্ষের জয়ের পথ খোঁজা জরুরি। শান্তি চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি, তবে দুই পক্ষই এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেয়নি। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা নিয়ে পুরো বিশ্ব এখন গভীর পর্যবেক্ষণে রয়েছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%