যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সংঘাত ও সম্পর্ক: ডোনাল্ড ট্রাম্পের উভয় মেয়াদের মূল ঘটনাপ্রবাহ

ছবি সংগ্রহকৃত
মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের উভয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সম্পর্ক অত্যন্ত উত্তপ্ত ও সংঘাতময় হয়ে উঠেছে। দুই দেশের এই দীর্ঘ ও জটিল বৈরিতার প্রধান ঘটনাপ্রবাহ নিচে তুলে ধরা হলো:
বিজ্ঞাপন
পারমাণবিক চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকে মার্কিন সরে দাঁড়ানো
- ২০১৫ সাল: ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন, ফ্রান্স, জার্মানি, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরান ঐতিহাসিক পারমাণবিক চুক্তি তথা ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অফ অ্যাকশন’স্বাক্ষর করে। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার মধ্যস্থতায় এই চুক্তির আওতায় ইরানের ফোরডো পারমাণবিক কেন্দ্রে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ৩.৬৭ শতাংশে সীমাবদ্ধ রাখা হয় এবং বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।
- ৮ মে, ২০১৮: নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে প্রত্যাহার করে নেন। তিনি চুক্তিটিকে “ভয়ংকর ও ত্রুটিপূর্ণ” বলে অভিহিত করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান জানায় তারা ওয়াশিংটনকে এড়িয়ে অন্যান্য স্বাক্ষরকারী দেশের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাবে।
‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগ ও নিষেধাজ্ঞার সূচনা
- ২১ মে, ২০১৮: ওয়াশিংটন ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বাদ দেওয়া থেকে শুরু করে সিরিয়ার যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ানোর মতো ব্যাপক পরিবর্তন আনার দাবি জানায়, অন্যথায় কঠোর নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হওয়ার হুশিয়ারি দেয়। তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও ১২ দফা দাবি পেশ করলেও তেহরান তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে।
- ৭ আগস্ট ও ৫ নভেম্বর, ২০১৮: যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর দফায় দফায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর মধ্যে বিমান চালনা, কার্পেট, সোনা এবং বিশেষ করে ইরানের তেল ও ব্যাংকিং খাতকে টার্গেট করা হয়।
- ৮ এপ্রিল, ২০১৯: ট্রাম্প ইরানের অভিজাত বাহিনী ইসলামিক রেভোলিউশন গার্ড কর্পসকে “বিদেশী সন্ত্রাসী সংগঠন” (FTO) হিসেবে চিহ্নিত করেন। প্রতিশোধ হিসেবে তেহরান মার্কিন বাহিনীকে “সন্ত্রাসী গোষ্ঠী” বলে ঘোষণা করে।
আঞ্চলিক সংঘাত ও সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি
- ৫ মে, ২০১৯: জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন মধ্যপ্রাচ্যে একটি বিমানবাহী রণতরী স্ট্রাইক গ্রুপ এবং বোমারু বিমান মোতায়েনের ঘোষণা দেন। এর তিন দিন পর ইরানও জেসিপিওএ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেওয়ার ঘোষণা দেয়।
- ডিসেম্বর ২০১৯: ইরাকি সামরিক ঘাঁটিতে রকেট হামলায় এক মার্কিন ঠিকাদার নিহত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ইরাক ও সিরিয়ায় ইরান-সমর্থিত কাতাইব হিজবুল্লাহর অবস্থানে বিমান হামলা চালায়।
- ৩ জানুয়ারি, ২০২০: বাগদাদে মার্কিন ড্রোন হামলায় আইআরজিসির কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলেইমানি নিহত হন। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় এবং ট্রাম্প ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। একই সময়ে ভুলের বশে ইরানের ছদ্মবেশে ইউক্রেনের একটি যাত্রীবাহী বিমান ভূপাতিত হলে ১৭৬ জন নিহত হন।
দ্বিতীয় মেয়াদ ও নতুন করে সামরিক সংঘাত
- জানুয়ারি ২০২১: জো বাইডেন ক্ষমতা গ্রহণের পর ভিয়েনায় চুক্তি পুনর্বহালের পরোক্ষ আলোচনা শুরু হলেও তা ব্যর্থ হয়। এই সময়ে ইরানের নাতাঞ্জ পারমাণবিক কেন্দ্রে বিস্ফোরণ ও হামলার ঘটনা ঘটে, যার জন্য ইসরাইলকে দায়ী করা হয় এবং ইরান ৬০ শতাংশ পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ শুরু করে।
- ২০২৫ সাল: ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদে অভিষিক্ত হয়ে ইরানের ওপর “সর্বোচ্চ চাপ” পুনরুদ্ধারের ঘোষণা দেন। মে মাসে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদী শান্তির ইঙ্গিতের পাশাপাশি হুথিদের লোহিত সাগর হামলার ঘটনায় ট্রাম্প ফের কঠোর অবস্থান নেন।
- ১৩ জুন ও ২২ জুন, ২০২৬: ইসরাইল ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক সাইটে হামলা চালায়। এর ১২ দিন পর যুক্তরাষ্ট্রও সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে এবং ইরানের তিনটি পারমাণবিক স্থাপনায় আক্রমণ করে। ইরান কাতারে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে সীমিত পাল্টা হামলা চালানোর পর ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেন।
- জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি ২০২৬: ইরানি মুদ্রার চরম দরপতন ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকটের জেরে বিক্ষোভ শুরু হয়। পরবর্তীতে ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন, যা নতুন করে ভয়াবহ যুদ্ধের সূচনা করে।
জেনেভায় বর্তমান শান্তি আলোচনার উদ্যোগ
- বর্তমান পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যেকার যুদ্ধের অবসান ঘটাতে এবং হরমুজ প্রণালী দিয়ে যানবাহন চলাচল পুনরায় চালুর লক্ষ্যে ৬০ দিনের একটি আলোচনা প্রক্রিয়া শুরু করতে শুক্রবার জেনেভায় একটি প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হতে চলেছে।
- শান্তি আলোচনায় মধ্যস্থতার নেতৃত্ব দিচ্ছে পাকিস্তান এবং সুইজারল্যান্ডে এই স্বাক্ষর অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার কথা রয়েছে। তবে চুক্তির সুনির্দিষ্ট বিস্তারিত তথ্য এখনও কোনো পক্ষই প্রকাশ করেনি।
তথ্যসূত্র: আল জাজিরা
0%
0%
0%
0%