অস্ট্রেলিয়া সফরে বাংলাদেশের উত্থান ও পতন: ডারউইনের রূপকথা শেষে ম্যাকায়ে হতাশাজনক আত্মসমর্পণ

অস্ট্রেলিয়া সফর থেকে মিশ্র অভিজ্ঞতার স্মৃতি নিয়ে দেশে ফিরছে বাংলাদেশ। ডারউইনের রূপকথার মতো জয় দিয়ে শুরু হলেও ম্যাকাই টেস্টের বিপর্যয় টাইগারদের মনে করিয়ে দিল, ক্রিকেটের ভাগ্য কতটা দ্রুত বদলে যেতে পারে। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়া সফরে গিয়ে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছিল, দীর্ঘ পাঁচ দিন চাপের মুখে টিকে থাকার সক্ষমতা তাদের রয়েছে। ডারউইনে অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে প্রথমবারের মতো টেস্ট জয়ের যে ইতিহাস বাংলাদেশ গড়েছিল, অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর মতে তা দেশের ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে বড় অর্জন। এই জয়ের সুবাদে আইসিসি টেস্ট র্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশ ৬ নম্বর অবস্থানে উঠে আসে, যা তাদের ইতিহাসের সেরা সাফল্য।
তবে ডারউইনের সেই আনন্দ স্থায়ী হয়নি ম্যাকাই টেস্টে। সেখানে ইনিংস ও ৫১ রানে পরাজিত হওয়ার পাশাপাশি এক বিব্রতকর রেকর্ডেরও সাক্ষী হয়েছে বাংলাদেশ। দীর্ঘ ২১ বছরের মধ্যে প্রথম দল হিসেবে কোনো টেস্টের দুই ইনিংসে ১০০ রানের নিচে অলআউট হওয়ার লজ্জায় পড়েছে টাইগাররা, যেখানে তাদের সংগ্রহ ছিল যথাক্রমে ৬৪ ও ৯৫ রান। ডারউইনে দ্রুততম এশীয় দল হিসেবে টেস্ট জয়ের আনন্দ আর ম্যাকাইয়ের এই শোচনীয় পরাজয়—একই সফরে দুই চরম বাস্তবতাকে দেখল বাংলাদেশ। সাম্প্রতিক সময়ে নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট জয় টাইগারদের অগ্রগতির বড় প্রমাণ হলেও, ঐতিহাসিক জয়ের পর ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে না পারা এবং সেনাজাতীয় কন্ডিশনে খেলার সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
ম্যাকাইয়ের পিচের বাউন্স ও গতি সামলাতে হিমশিম খেয়েছেন বাংলাদেশের ব্যাটাররা। অফ স্টাম্পের বাইরের বলগুলো ছেড়ে দেওয়ার পরিবর্তে বারবার ব্যাট চালিয়ে উইকেট বিলিয়ে দেওয়ার প্রবণতা তাদের বিপদ ডেকে এনেছে। জিম্বাবুয়ে সফরের ব্যর্থতা থেকে শিক্ষা নিতে না পারার আক্ষেপটাও এখানে স্পষ্ট। তবে ডারউইনের কন্ডিশন কিছুটা বাংলাদেশের অনুকূলে থাকায় ব্যাটাররা ভালো করার সুযোগ পেয়েছিলেন। দলের এমন ওঠানামা নিয়ে অধিনায়ক শান্তর মতে, এর পেছনে আবেগের চেয়ে বাজে ক্রিকেটই বড় ভূমিকা রেখেছে। ২০২২ সালে মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ঐতিহাসিক জয়ের পর ক্রাইস্টচার্চে দ্বিতীয় টেস্টে বড় পরাজয়ের তিক্ত অভিজ্ঞতার পুনরাবৃত্তি যেন হলো এবারও।
ম্যাকাইয়ের পরাজয়ের পর শান্ত জানান, খেলোয়াড়রা মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকলেও শেষ পর্যন্ত নিজেদের সেরাটা দিতে পারেনি। তিনি মনে করেন, উইকেট কঠিন হলেও ব্যাটারদের শট নির্বাচনে ভুল ছিল এবং দলগতভাবে বাংলাদেশ ভালো খেলতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে ডারউইনের জয়কে তিনি ছোট করে দেখছেন না। অস্ট্রেলিয়াকে তাদেরই মাটিতে হারানোর গুরুত্ব তুলে ধরে শান্ত বলেন, এই জয় খেলোয়াড়দের নভেম্বরে আসন্ন দক্ষিণ আফ্রিকা সফরের জন্য আত্মবিশ্বাস জোগাবে।
ডারউইনের ঐতিহাসিক জয় বাংলাদেশ ক্রিকেটের জন্য এক অনন্য অর্জন। তানজিদ হাসান তামিমের ক্যারিয়ারের প্রথম টেস্ট সেঞ্চুরি, হাসান মাহমুদ ও শরিফুল ইসলামের দুর্দান্ত বোলিং এবং মেহেদী হাসান মিরাজের অলরাউন্ড পারফরম্যান্স এই সফরের ইতিবাচক দিক। এছাড়া প্রথম টেস্টে অধিনায়ক শান্তর ব্যাট থেকেও এসেছে অসাধারণ নৈপুণ্য। বড় দলের বিপক্ষে জয় পাওয়ার সক্ষমতা প্রদর্শন করলেও, প্রত্যাশার চাপ সামলে দীর্ঘ পরিসরের ক্রিকেটে ধারাবাহিকতা বজায় রাখাই এখন বাংলাদেশের সামনে মূল চ্যালেঞ্জ।
