প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ছোঁয়ায় নতুন যুগে ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

ফুটবল বিশ্বের সর্বকালের সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ আসর হিসেবে পরিচিতি পেতে যাচ্ছে ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডার যৌথ আয়োজনে হতে যাওয়া ৩৯ দিনব্যাপী এই টুর্নামেন্ট কেবল অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যার দিক থেকেই রেকর্ড গড়বে না, বরং অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগে ফুটবল দেখার অভিজ্ঞতাকে নিয়ে যাবে অনন্য উচ্চতায়। মাঠের লড়াইকে আরও নির্ভুল ও আকর্ষণীয় করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর সমন্বয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা।
টুর্নামেন্টের অফিসিয়াল বল ‘ত্রিওন্দা’-তে যুক্ত করা হয়েছে আইএমইউ সেন্সর চিপ। এটি প্রতি সেকেন্ডে ৫০০ বার বলের গতিপ্রকৃতি ও ত্বরণ পরিমাপ করে ত্রিমাত্রিক তথ্য সরবরাহ করবে। ফিফার গবেষণা ও মানদণ্ড বিভাগের প্রধান নিকোলাস ইভান্সের মতে, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে মাঠের প্রতিটি মুহূর্তে বলের অবস্থান নিখুঁতভাবে জানা সম্ভব হবে, যা ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি বা ভিএআর ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে। বিশেষ করে অফসাইড বা সূক্ষ্ম ভুলগুলো সংশোধনে রেফারিদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া এখন হবে অনেক বেশি দ্রুত ও নির্ভুল।
খেলোয়াড়দের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণেও যুক্ত হয়েছে এআই-চালিত থ্রিডি অবতার। লেনোভোর সাথে অংশীদারিত্বের মাধ্যমে প্রতিটি খেলোয়াড়কে ডিজিটাল স্ক্যান করে নিখুঁত থ্রিডি মডেল তৈরি করা হবে। মাত্র এক সেকেন্ডে সম্পন্ন হওয়া এই স্ক্যানিং পদ্ধতি খেলোয়াড়দের শরীরের প্রতিটি অঙ্গের পরিমাপ নিশ্চিত করবে, যা দ্রুতগতির বা জটিল মুভমেন্টের সময় অফসাইড শনাক্তকরণে বড় ভূমিকা রাখবে। এছাড়া ১০৪টি ম্যাচের সবকটিতে রেফারি বডি ক্যামেরা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফিফা, যার ফলে দর্শকরা মাঠের ভেতরে থাকা রেফারির দৃষ্টিকোণ থেকে খেলা দেখার রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা পাবেন।
নিরাপত্তা নিশ্চিতেও প্রযুক্তির ওপর জোর দিয়েছে আয়োজকরা। মেক্সিকোর গুয়াদালুপে শহরে পুলিশের সহায়তায় ব্যবহার করা হবে রোবোটিক ডগ। প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার ডলার ব্যয়ে কেনা এই স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রগুলো বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে সরাসরি ভিডিও সম্প্রচার করবে, যা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের জীবনের ঝুঁকি কমিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সাহায্য করবে। মেয়র হেক্টর গার্সিয়া জানিয়েছেন, প্রাথমিক হস্তক্ষেপের সময় পুলিশ কর্মকর্তাদের শারীরিক সুরক্ষায় এই রোবটগুলো অনন্য ভূমিকা রাখবে।
অফসাইড নিয়ে খেলোয়াড় ও দর্শকদের দীর্ঘদিনের হতাশা দূর করতে ফিফা নিয়ে আসছে উন্নত সেমি-অটোমেটেড অফসাইড প্রযুক্তি। আগে ৫০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত অফসাইডের সংকেত পাওয়া গেলেও, নতুন সংস্করণে ১০ সেন্টিমিটার অফসাইডও তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। রেফারি সরাসরি ইয়ারপিসে অডিও সংকেত পাবেন, ফলে খেলা থামিয়ে দীর্ঘক্ষণ সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে হবে না। যদিও খুব সূক্ষ্ম বা খেলোয়াড়দের শরীরের জটলা থাকা পরিস্থিতিতে এর কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবুও ফিফা মনে করছে এটি খেলার মান ও গতি বাড়াতে সহায়ক হবে।
খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যের কথা মাথায় রেখে টুর্নামেন্টের প্রতিটি ম্যাচে তিনটি করে হাইড্রেশন বিরতি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। ম্যাচের প্রথমার্ধ ও দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি সময়ে (প্রায় ২২তম মিনিটে) ৩ মিনিট করে এই বিরতি পালন করা হবে। টুর্নামেন্ট কর্মকর্তা ম্যানোলো জুবিরিয়া জানিয়েছেন, আবহাওয়া বা তাপমাত্রা যেমনই হোক না কেন, খেলোয়াড়দের শারীরিক সুস্থতা নিশ্চিত করাই ফিফার প্রধান লক্ষ্য। সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপ প্রযুক্তির মেলবন্ধনে ফুটবল ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় হতে চলেছে।
