দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

ছাত্রনেতা থেকে শিক্ষক, তৃণমূলের রাজনীতির সিঁড়ি বেয়ে সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী—এমন বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের দীর্ঘ পরিক্রমা শেষে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নিয়েছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। শুক্রবার সন্ধ্যায় বঙ্গভবনে আয়োজিত এক রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত স্পিকার কায়সার কামাল তাকে শপথবাক্য পাঠ করান। এর মধ্য দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে আসীন হলেন অভিজ্ঞ এই রাজনীতিবিদ।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুল ২৫৫ ভোট পেয়ে নিরঙ্কুশ জয়লাভ করেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট সমর্থিত প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদ পেয়েছেন ৮৮ ভোট। জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে ৩৪৯ জন ভোটারের মধ্যে ৩৪৩ জন তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের জন্ম ১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও শহরের কালীবাড়ি এলাকায়। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও পাকিস্তান প্রাদেশিক আইনসভার সদস্য, যিনি পরবর্তীকালে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ সদস্য ও মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী মির্জা ফখরুল ছাত্রজীবন থেকেই তুখোড় রাজনীতিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রাখা এই নেতা কর্মজীবনের শুরুতে ঢাকা কলেজের অর্থনীতি বিভাগে শিক্ষকতা করতেন। তবে বৃহত্তর সেবার ব্রত নিয়ে ১৯৮৬ সালে শিক্ষকতা ছেড়ে তিনি পূর্ণাঙ্গ রাজনীতিতে আত্মনিয়োগ করেন। আবদুল হামিদ খান ভাসানীর ন্যাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু করলেও পরবর্তীতে তিনি বিএনপিতে যোগ দিয়ে নিজের যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখেন।
২০০১ সালে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে তিনি কৃষি এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়া তিনি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়েরও নেতৃত্ব দিয়েছেন। দলের কঠিন সময়ে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব এবং পরবর্তীতে মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি বিএনপির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে অসামান্য নেতৃত্ব প্রদান করেন।
বিশেষ করে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় দলীয় আন্দোলন ও সাংগঠনিক কাঠামো শক্তিশালী করতে মির্জা ফখরুল সামনের সারিতে থেকে ভূমিকা রেখেছেন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে জীবনের দীর্ঘ সময় তাকে কারাভোগ করতে হয়েছে। শিক্ষকতা থেকে রাষ্ট্রপতির এই দীর্ঘ যাত্রা মূলত তার আপসহীন রাজনৈতিক আদর্শেরই প্রতিফলন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি রাহাত আরা বেগমের স্বামী এবং দুই কন্যাসন্তানের জনক। তার স্ত্রী একটি বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করেছেন। বড় মেয়ে মির্জা শামারুহ অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো হিসেবে কর্মরত এবং ছোট মেয়ে মির্জা সাফারুহ ঢাকায় শিক্ষকতায় নিয়োজিত রয়েছেন। শ্রেণিকক্ষের পাঠদান থেকে রাষ্ট্রপতির গুরুদায়িত্ব—এই রূপান্তর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল।
