ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ সাংবাদিকতার চরম অবক্ষয় ও ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ

লেখক: আল আমিন
প্রকাশিত: ১৫ জুন ২০২৬, ০৯:৪১ অপরাহ্ন

গণমাধ্যমে প্রায়শই একটি ভয়ংকর, বেআইনি ও চরম লজ্জাজনক চিত্র আমাদের সামনে ভেসে ওঠে। ধর্ষণের বা যৌন নির্যাতনের শিকার কোনো নারী বা ব্যক্তির পরিচয়, ছবি, কিংবা এমন কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হচ্ছে, যা দিয়ে তাকে সহজেই চিনে ফেলা যায়। গণমাধ্যমের সাথে যুক্ত প্রতিটি বিবেকবান মানুষের জন্য এটি চূড়ান্ত লজ্জার বিষয়। এটি কেবল একটি ‘সাধারণ ভুল’ নয়, এটি দায়িত্বের চরম গাফিলতি এবং পেশাদারিত্বের নামে এক ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ।

দেশের প্রচলিত আইন এবং সাংবাদিকতার মৌলিক নীতিমালার প্রথম পাঠেই অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বলা আছে—কোনো অবস্থাতেই ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না। অথচ, অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হলো, সস্তা জনপ্রিয়তা, ক্লিকবেট কিংবা টিআরপি (TRP)-এর অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমে কিছু গণমাধ্যম এই স্পর্শকাতর বিষয়টি বেমালুম পায়ে মাড়িয়ে যাচ্ছে। ভিকটিমের নাম সরাসরি প্রকাশ না করলেও তার পেশা, পরিবারের সদস্যদের পরিচয়, গ্রাম বা বাড়ির ছবি এমনভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, যা তার পরিচয়কে সমাজের কাছে দিনের আলোর মতো স্পষ্ট করে দিচ্ছে। একে কোনোভাবেই ‘সাংবাদিকতা’ বলা চলে না; এটি সস্তা, দায়িত্বহীন এবং জঘন্য এক হলুদ আগ্রাসন।

বিজ্ঞাপন

যিনি ইতিমধ্যেই একটি ভয়াবহ মানসিক ও শারীরিক ট্রমার ভেতর দিয়ে যাচ্ছেন, গণমাধ্যমের এই দায়িত্বহীনতা তাকে সামাজিকভাবে দ্বিতীয়বার ধর্ষণের শিকার হতে বাধ্য করে। সমাজ ও রাষ্ট্রের কাছে তাকে নতুন করে হেনস্তার মুখে ঠেলে দেওয়া হয়। এর ফলে ন্যায়বিচারের পথ তো রুদ্ধ হয়ই, উল্টো ভিকটিম ও তার পরিবারকে তীব্র সামাজিক লাঞ্ছনার মুখে পড়তে হয়। গণমাধ্যমের এই অবিবেচক ও নিষ্ঠুর আচরণের কারণে অসংখ্য ভুক্তভোগী আইনি লড়াইয়ে যাওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলেন। এই দায় কার? এই দায়ভার কি সেইসব তথাকথিত দায়িত্বহীন সাংবাদিক ও সম্পাদকরা নেবেন?

সাংবাদিকতার মূল লক্ষ্য হলো সমাজের দর্পণ হওয়া, নির্যাতিতের কণ্ঠস্বর হওয়া এবং ন্যায়বিচারের পক্ষে শক্ত অবস্থান নেওয়া—তাদের আত্মসম্মান বিকিয়ে দিয়ে ব্যবসা করা নয়। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদক, বার্তা সম্পাদক এবং সর্বোপরি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই অমার্জনীয় ব্যর্থতার দায় নিতেই হবে। “ভুলবশত হয়ে গেছে” বা “অসাবধানতাবশত” বলে পার পাওয়ার দিন শেষ।

বিজ্ঞাপন

তথ্য মন্ত্রণালয়, প্রেস কাউন্সিল এবং গণমাধ্যমগুলোর নিজস্ব কাঠামোর ভেতরে এই বিষয়ে অবিলম্বে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করতে হবে। যেসব প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি এই নীতি লঙ্ঘন করবে, তাদের শুধু তিরস্কার নয়, বরং কঠোর আইনি শাস্তির আওতায় আনা এখন সময়ের দাবি।

সাংবাদিকতা কোনো ছেলেখেলা নয়, আর মানুষের সম্মান ও জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলার অধিকার কোনো গণমাধ্যমের নেই। সাংবাদিকতার নামে এই বিকৃত প্রতিযোগিতা, নির্লজ্জতা ও দায়িত্বহীনতার চিরস্থায়ী অবসান চাই—এবং তা এখনই।

লেখক: আল আমিন - সম্পাদক ও প্রকাশক, সে অলওয়েজ ট্রুথ
টপিক: ধর্ষণ
Google News গুগল নিউজে ফলো করুন
হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেলে যুক্ত হোন
0%
0%
0%
0%