জীবিকার টানে একসময়ে অবৈধ পথে ভারতে পাড়ি জমিয়ে পাথর ভাঙার কঠিন শ্রমের জীবন পেছনে ফেলে নিজ গ্রামেই পেঁপে বাগান করে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ ছাতইল গ্রামের যুবক জুয়েল ইসলাম। গত জানুয়ারি মাসে শুরু করা এই উদ্যোগে তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন গ্রামের আরও দুই যুবক মুসাদ্দেক ইসলাম ও মমিনুল ইসলাম। তিনজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ৭০ শতক লিজ নেওয়া জমিতে গড়ে ওঠা এই বাগান এখন তাদের ভাগ্য বদলের সোনালী দুয়ার খুলে দিয়েছে।
বিদেশের মাটিতে চরম অনিশ্চয়তা ও কষ্টের দিন কাটিয়ে দেশে ফিরে নতুন কিছু করার স্বপ্ন দেখেন জুয়েল ইসলাম। ২০১৯ সালের দিকে দেশে কর্মসংস্থানের অভাব থাকায় কাজের সন্ধানে ভারতে গিয়েছিলেন তিনি। সেখানে দীর্ঘ প্রায় তিন বছর পাথর ভাঙার ঝুঁকিপূর্ণ ও কষ্টকর কাজ করে কোনোমতে দিনাতিপাত করেন। একপর্যায়ে বিদেশের সেই মানবেতর জীবন ছেড়ে দেশে ফিরে আসার পর অন্যের অধীনে কাজ না করে নিজের মেধা ও পরিশ্রমে কিছু গড়ার দৃঢ় প্রতিজ্ঞায় অটল হন তিনি।
জুয়েলের এই পেঁপে চাষের উদ্যোগে সহযোগী হিসেবে হাত বাড়িয়ে দেন পেশায় রংমিস্ত্রি মুসাদ্দেক ইসলাম ও মমিনুল ইসলাম। সারা বছর কাজের ধারাবাহিকতা না থাকায় তাদেরও বেকারত্ব ও আর্থিক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে দিন কাটছিল। বিকল্প আয়ের পথ খুঁজতে গিয়ে তারা জুয়েলের সঙ্গে একাত্ম হয়ে সীমিত পুঁজি নিয়ে কৃষিকাজকে বেছে নেন। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে স্থানীয় রাণীগঞ্জ বাজার থেকে উন্নত জাতের শাহী পেঁপের চারা সংগ্রহ করে জমি প্রস্তুত করে রোপণ করেন এই তিন তরুণ।
পরিশ্রম আর নিয়মিত পরিচর্যার সুফল পেতে খুব বেশি দিন অপেক্ষা করতে হয়নি তাদের। চারা রোপণের প্রায় আট মাস পর থেকেই গাছে ফল ধরতে শুরু করে। বর্তমানে প্রায় ১০ মাস বয়সী এই বাগানে ছোট-বড় মিলিয়ে ৭০০টির বেশি পেঁপেগাছ রয়েছে, যা এখন থোকা থোকা কাঁচা-পাকায় ফলে পরিপূর্ণ। স্থানীয় বাজারে পেঁপের ব্যাপক চাহিদা থাকায় ইতোমধ্যে তারা প্রায় এক লাখ ৮০ হাজার টাকার পেঁপে বিক্রি করেছেন। বাগানে থাকা অবশিষ্ট ফল বিক্রি করে আরও পাঁচ লাখ টাকার বেশি আয়ের আশা করছেন এই উদীয়মান উদ্যোক্তারা।
নিজের সফলতার পেছনের অনুভূতি প্রকাশ করে জুয়েল ইসলাম জানান, অবৈধ পথে ভিনদেশে গিয়ে অমানবিক পরিশ্রম করার চেয়ে নিজ দেশের মাটিতে কায়িক পরিশ্রম করা অনেক বেশি সম্মানজনক। বেকার যুবকদের কেবল চাকরির পেছনে না ছুটে যৌথভাবে হলেও কৃষি বা অন্য কোনো উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, সততা ও পরিশ্রম থাকলে দেশেই নিজের ভাগ্য বদলানো সম্ভব।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা নয়ন কুমার সাহা বলেন, পেঁপে একটি অত্যন্ত লাভজনক ও সম্ভাবনাময় ফসল। সঠিক জাতের চারা নির্বাচন, নিয়মিত পরিচর্যা এবং সময়মতো রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা গেলে এ চাষে বাম্পার ফলন ও বাম্পার আয় করা সম্ভব। কাঁচা ও পাকা—উভয় অবস্থাতেই পেঁপে বিক্রির সুবিধা থাকায় কৃষকরা সহজেই বাজারের চাহিদা মেটাতে পারেন। জুয়েল ইসলামের মতো উদ্যমী তরুণেরা কৃষিকাজে এগিয়ে এলে একদিকে যেমন নিজেদের কর্মসংস্থান তৈরি হয়, তেমনি তা অন্য যুবকদেরও দারুণভাবে উৎসাহিত করে। কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে এই তরুণ উদ্যোক্তাদের সব ধরনের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।