পাবনায় তীব্র লোডশেডিং ও তাপপ্রবাহে পোলট্রি শিল্পে বিপর্যয় বাড়ছে লোকসান

পাবনা জেলায় তীব্র তাপপ্রবাহ ও ভয়াবহ লোডশেডিংয়ের কবলে পড়ে পোলট্রি শিল্প এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। বিদ্যুতের ঘন ঘন বিভ্রাটে হিটস্ট্রোকে প্রতিদিন মারা যাচ্ছে শত শত মুরগি, যার ফলে আশঙ্কাজনক হারে কমেছে ডিমের উৎপাদন। একদিকে পোলট্রি খাদ্য ও ওষুধের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি, অন্যদিকে বিদ্যুৎ সংকটের ফলে সৃষ্ট লোকসানে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন জেলার প্রান্তিক খামারিরা।
২০০০ সালের পর থেকে সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পাবনায় কয়েক হাজার ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামার গড়ে উঠেছিল। একসময়ে দেশের অন্যতম প্রধান ডিম উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে পরিচিতি পেলেও বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন। বড় পুঁজির সিন্ডিকেটের কারসাজিতে মুরগির বাচ্চা, ফিড ও ওষুধের দাম কয়েক গুণ বাড়লেও উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না খামারিরা। অসম প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে গত কয়েক বছরে জেলায় প্রায় সাত হাজার খামার স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
সদর উপজেলার সানিকদিয়ার মণ্ডলপাড়া এলাকার নাজমা খাতুন এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে ৩৫০টি ব্রয়লার মুরগি পালন শুরু করেছিলেন। কিন্তু গত এক সপ্তাহে প্রতিদিন ৫ থেকে ৭ ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় প্রচণ্ড গরমে তার খামারের ৮০টি মুরগি মারা গেছে। এতে তার প্রায় ৩০ হাজার টাকা ক্ষতি হয়েছে। অবশিষ্ট মুরগিগুলোও লোকসানের আশঙ্কায় কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি।
জেলায় বর্তমানে লেয়ার, ব্রয়লার ও সোনালি জাতের মিলিয়ে ৩,০৪৩টি খামার টিকে আছে, যেখানে পাঁচ বছর আগেও এই সংখ্যা ছিল ১০ হাজার। খামারিদের অভিযোগ, পাবনার বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন ৬ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং সঠিক আলো-বাতাস নিশ্চিত করতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ অপরিহার্য হলেও মিলছে না পর্যাপ্ত সেবা। জেনারেটর বা আইপিএস চালিয়ে বিকল্প ব্যবস্থায় খামার টিকিয়ে রাখতে গিয়ে উৎপাদন খরচ খামারিদের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে।
মালিগাছা ইউনিয়নের মাহমুদপুর বাজারের লেয়ার খামারি ওয়াসিমের খামারে ৩,৩০০ মুরগির মধ্যে এখন টিকে আছে মাত্র ১,০০০টি। লোডশেডিংয়ের কারণে মুরগির রোগবালাই বৃদ্ধি পাওয়ায় ডিমের উৎপাদন প্রতিদিন ৩২-৩৫ খাচি থেকে নেমে এসেছে ২৪-২৬ খাচিতে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি ২,৪০০ মুরগি অর্ধেক দামে বিক্রি করে দিয়েছেন। পাবনা জেলা পোলট্রি ফার্ম অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক আকমল হোসেন জানান, জেনারেটর পরিচালনায় প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১,০০০ টাকা অতিরিক্ত খরচ হওয়ায় অনেক খামারিই ব্যবসা গুটিয়ে নিচ্ছেন।
এ বিষয়ে পাবনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১-এর জেনারেল ম্যানেজার আবদুল্লাহ আল আমিন চৌধুরী জানান, গ্যাস সংকটের কারণে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, তবে দ্রুতই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার আশা করা যাচ্ছে। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. জহুরুল ইসলাম জানান, খামারিদের স্যালাইন ও বিটেইন ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে এবং পোলট্রি খাতে ভর্তুকি প্রদানের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। সরকারি সহায়তা ও বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে দেশের ডিম ও মাংসের বাজারে বড় ধরনের বিপর্যয়ের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
