নগর সেবায় সমন্বয়হীনতা নিরসনে চট্টগ্রাম নগর সরকার গঠনের দাবি জোরালো

চট্টগ্রাম নগরীর সেবাদানকারী বিভিন্ন সরকারি সংস্থার মধ্যকার চরম সমন্বয়হীনতা এবং উন্নয়ন কাজের পুনরাবৃত্তির ফলে নাগরিক ভোগান্তি চরমে পৌঁছেছে। বন্দরনগরীর প্রায় ৭০ লাখ অধিবাসী বর্তমানে মেগা প্রকল্পগুলোর সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, ওয়াসা, বিদ্যুৎ বিভাগ, কর্ণফুলী গ্যাসসহ অন্তত ২৫টি সরকারি সংস্থা আলাদাভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও কার্যক্রম পরিচালনা করায় পুরো নগরীতে এক বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
সচেতন নাগরিক ও নগরবিদদের মতে, এই সংকটের স্থায়ী সমাধানে মেয়রের নেতৃত্বে পূর্ণাঙ্গ ‘নগর সরকার’ ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবি এখন সময়ের দাবি। বর্তমানে সিটি করপোরেশনের মেরামত করা সড়ক সপ্তাহ না পেরোতেই ওয়াসা বা বিদ্যুৎ বিভাগ খুঁড়ে ফেলায় রাষ্ট্রের বিপুল অর্থ অপচয় হচ্ছে এবং প্রতিনিয়ত ঘটছে দুর্ঘটনা। আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় প্রকল্পের অনুমোদন পেতে রাজধানীর ওপর নির্ভরশীলতা এবং ফাইলবন্দী হয়ে থাকার সংস্কৃতি নগরীর উন্নয়নকে স্থবির করে দিয়েছে।
সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় শাসনের ওপর যে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে, তা বাস্তবায়িত না হওয়ায় সিটি করপোরেশনের স্বায়ত্তশাসন অনেকাংশে অকার্যকর হয়ে পড়েছে। অথচ বিশ্বের বড় শহরগুলোতে নির্বাচিত মেয়রের অধীনে একীভূত ‘সিটি গভর্নমেন্ট’ সফলভাবে কাজ করছে। চট্টগ্রামকে পাইলট প্রকল্প হিসেবে বেছে নিয়ে সব সেবা এক ছাতার নিচে আনা গেলে নাগরিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সম্ভব হতো বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন জানিয়েছেন, সরকারি সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা দূর করতে তিনি কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের পক্ষে। মেয়র বলেন, নগর সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে প্রতিটি সেবা সংস্থাকে তিন মাস অন্তর সমন্বিত পরিকল্পনায় অংশ নিতে হবে এবং গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে বাধ্যবাধকতা থাকবে। অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো এখন অনিবার্য।
নগর বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও ত্রুটিপূর্ণ প্রশাসনিক ব্যবস্থার কারণে চট্টগ্রাম বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। সরকারি হিসেবে জনসংখ্যা ৩৩ লাখ হলেও বাস্তবে এখানে ৬০ থেকে ৭০ লাখ মানুষ বসবাস করে, যাদের নাগরিক সেবার চাপ সামলাতে সিটি করপোরেশন হিমশিম খাচ্ছে। বন্দরের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে হলে শহরের অবকাঠামোগত সেবার সমন্বয় ও স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা জরুরি।
বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব জিয়া হাবীব আহসান জানান, নগর সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তিত হলে সেবার দ্বৈধতা কমবে এবং দায় চাপানোর সংস্কৃতির বিলুপ্তি ঘটবে। এতে জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা বাড়বে এবং বাণিজ্যিক রাজধানীর মর্যাদা পুনরুদ্ধারে সুশাসন নিশ্চিত হবে। এ ধরনের পরিকল্পিত উদ্যোগ ছাড়া মেগাসিটির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা অসম্ভব বলে মনে করছেন নগর বিশেষজ্ঞ ও সচেতন মহল।
