চাকরির প্রলোভনে রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধে বাংলাদেশসহ ২৯ দেশের নাগরিক

উচ্চবেতনে ড্রাইভার, পরিচ্ছন্নতাকর্মী কিংবা নির্মাণশ্রমিকের মতো বেসামরিক চাকরির লোভ দেখিয়ে বাংলাদেশসহ অন্তত ২৯টি দেশের নাগরিকদের রাশিয়ায় পাচার করা হয়েছে। পরে তাদের বাধ্য করা হয়েছে দেশটির সশস্ত্র বাহিনীর সামরিক চুক্তিতে সই করতে। ইউক্রেনবিষয়ক জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে উপস্থাপনের জন্য প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ৪৮টি দেশের নাগরিকদের রুশ বাহিনীতে নিয়োগের ঘটনা তদন্ত করে অন্তত ২৯টি দেশের ক্ষেত্রে প্রতারণা ও জবরদস্তির স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই তালিকায় বাংলাদেশ ছাড়াও রয়েছে ভারত, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ফিলিপাইন, নাইজেরিয়া, কেনিয়া ও উজবেকিস্তানের মতো দেশগুলো।

প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, প্রতারণার শিকার ব্যক্তিদের সবাই ১৮ থেকে ৬০ বছর বয়সী পুরুষ। আর্থিক অসচ্ছলতা ও সীমিত শিক্ষার সুযোগ থাকা প্রান্তিক পুরুষদের নিশানা বানিয়ে রাশিয়ায় আকর্ষণীয় বেতনের চাকরির মিথ্যা আশ্বাস দেওয়া হতো। বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে রাশিয়ার একটি বেসামরিক প্রতিষ্ঠানের আমন্ত্রণে ইস্যু করা ব্যবসায়িক ভিসার অনুলিপি সংগ্রহ করেছে কমিশন। ভ্রমণের উদ্দেশ্য কাগজে-কলমে বেসামরিক দেখানো হলেও আড়ালে বিদেশি নাগরিকদের রুশ সামরিক বাহিনীতে যুক্ত করার ফাঁদ পাতা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৈধ এজেন্সির ভুয়া পরিচয় দিয়ে এসব চক্র সক্রিয় ছিলো। ভুক্তভোগীরা রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে চলাফেরা সীমিত করা হতো। এরপর রুশ ভাষায় লেখা সামরিক চুক্তিতে জোরপূর্বক স্বাক্ষর করিয়ে নেওয়া হতো।

এক বাংলাদেশি ভুক্তভোগীর স্ত্রীর বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, তার স্বামীর হাত থেকে পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে শুধু রুশ ভাষায় লেখা চুক্তির বিভিন্ন পাতায় সই করতে বাধ্য করা হয়। ওই সময় তার স্বামীর সামনে আর কোনো বিকল্প ছিলো না।

সই করানোর পরপরই তাদের সরাসরি ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। বিপজ্জনক যুদ্ধক্ষেত্রে গিয়ে তাদের অনেকেই নিহত, আহত, বন্দী কিংবা নিখোঁজ হয়েছেন। ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের আগের এক তথ্যানুযায়ী, রাশিয়ায় এমন প্রতারণার শিকার হয়ে গত তিন বছরে অন্তত ৫৪ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন।

তদন্ত কমিশন জানিয়েছে, বিভিন্ন দেশের পাচারকারী চক্র ও দালালদের সঙ্গে রাশিয়ার কর্তৃপক্ষের উচ্চমাত্রার সমন্বয়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা সরাসরি মানবপাচার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের চরম লঙ্ঘন।

কমিশনের পক্ষ থেকে রাশিয়াকে অবিলম্বে এ ধরনের মানবপাচার বন্ধ করা, জোর করে নিয়োগপ্রাপ্তদের সামরিক বাহিনী থেকে অব্যাহতি দেওয়া এবং জড়িতদের বিচারে সমর্থ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বাংলাদেশসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সরকারকে পাচারকৃত নাগরিকদের ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার এবং দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।

০%
০%
০%
০%