নালিতাবাড়ীতে গোবরের গ্যাসে রান্নার জ্বালানি সংকট কাটছে অর্ধশত পরিবারের

শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার নন্নী গ্রামে গরুর গোবর প্রক্রিয়াজাত করে রান্নার পরিবেশবান্ধব জ্বালানি বায়োগ্যাস উৎপাদনের এক ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে দিন দিন ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করছে। বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং প্রচলিত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর এই সফল প্রয়াস এখন পুরো এলাকায় এক ইতিবাচক পরিবর্তনের হাওয়া বইয়ে দিয়েছে।

শেরপুর জেলা যুব উন্নয়ন অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, গ্রামের ডেকরাপাড়ার বাসিন্দা আবুল কালাম আজাদ তাঁর ছয়টি গবাদিপশুর গোবর ব্যবহার করে প্রতিদিন বায়োগ্যাস উৎপাদন করছেন। উৎপাদিত এই গ্যাস দিয়ে তাঁর নিজেরসহ দুটি পরিবারের নিয়মিত রান্নার কাজ সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে। গত ছয় মাস ধরে এই বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করায় সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর মাসিক প্রায় চার হাজার টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় হচ্ছে।

গ্রামের অন্য বাসিন্দারাও এই প্রযুক্তির সুফল পেতে শুরু করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দা ও মাদ্রাসাশিক্ষক খোকন মিয়া তিনটি গরু লালন-পালন করে সেখান থেকে বায়োগ্যাস উৎপাদন করছেন। নিজের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করে তিনি জানান, স্বামী-স্ত্রী উভয়েই চাকরিজীবী হওয়ায় পূর্বে খড়ির চুলায় রান্না করা অত্যন্ত সময়সাপেক্ষ ও কষ্টসাধ্য ছিল। বর্তমানে বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের ফলে একদিকে যেমন রান্নার কাজে সময় ও দুর্ভোগ দুটোই কমেছে, অন্যদিকে সিলিন্ডার গ্যাস ক্রয়ের পেছনে মাসিক দুই হাজার টাকা অর্থাৎ বছরে প্রায় ২৫ হাজার টাকা সাশ্রয় হচ্ছে। এছাড়া গোবরের প্রক্রিয়াজাত অবশিষ্ট অংশ চমৎকার জৈবসার হিসেবে কৃষিজমিতে ব্যবহৃত হওয়ায় ফসলের ফলন বাড়াতেও বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

প্রতিবেশীদের এই সাফল্য দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে নন্নী ইউনিয়নে বায়োগ্যাস ব্যবহারের প্রবণতা দ্রুত প্রসার লাভ করছে। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০টি পরিবার এই পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। এমনকি কিছু পরিবার গরুর গোবরের পাশাপাশি পোলট্রির বিষ্ঠা ব্যবহার করেও বায়োগ্যাস উৎপাদন করছেন।

এ বিষয়ে যুব উন্নয়ন অধিদফতরের বায়োগ্যাস প্লান্টের উপসহকারী প্রকৌশলী আব্দুল্লাহ আল মনসুর জানান, একটি বাড়িতে তিনটি গরু থাকলে সেখান থেকে দৈনিক প্রায় ৪০ থেকে ৫০ কেজি গোবর সংগ্রহ করা সম্ভব। এর মধ্যে মাত্র ২২ কেজি গোবর প্রক্রিয়াজাত করেই প্রায় এক কেজি গ্যাস পাওয়া যায়, যা দিয়ে একটি পরিবারের প্রতিদিনের রান্নার চাহিদা অনায়াসেই মেটানো সম্ভব।

গ্রামীণ পর্যায়ে বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার আরও প্রসারিত করতে যুব উন্নয়ন অধিদফতরের উদ্যোগে বর্তমানে ‘ইমপ্যাক্ট প্রকল্প ফেজ-৩’ বাস্তবায়িত হচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় শেরপুর জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট ৮৫টি বায়োগ্যাস প্লান্ট স্থাপনের কাজ চলমান রয়েছে, যার মধ্যে কেবল নালিতাবাড়ী উপজেলার নন্নী ইউনিয়নেই ইতোমধ্যে ৩০টি প্লান্ট স্থাপন করা হয়েছে। স্থানীয়দের এই স্বতঃস্ফূর্ত আগ্রহ ও অভাবনীয় সাফল্য বিবেচনা করে নন্নী ইউনিয়নকে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘বায়োগ্যাস পল্লি’ হিসেবে ঘোষণা করার পরিকল্পনা রয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। শেরপুর জেলা যুব উন্নয়ন অধিদফতরের উপপরিচালক হারুনর রশীদ আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, গ্রামীণ অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনের লক্ষ্যে সরকারের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে তা স্থানীয় জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে।

০%
০%
০%
০%