পাকিস্তানের ক্রিকেট ইতিহাসে ব্যাট হাতে অসাধারণ কৃতিত্বের জন্য স্মরণীয় হয়ে আছেন সাবেক অধিনায়ক মোহাম্মদ ইউসুফ। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে ধারাবাহিক ব্যাটিং, দৃষ্টিনন্দন শট এবং রেকর্ড গড়া পারফরম্যান্সের মাধ্যমে তিনি নিজেকে পাকিস্তানের অন্যতম সফল ব্যাটসম্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। বিশেষ করে ২০০৬ সালে টেস্ট ক্রিকেটে তাঁর অবিশ্বাস্য সাফল্য তাঁকে বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে বিশেষ অবস্থান এনে দেয়।
লাহোরে জন্ম, ক্রিকেটে উঠে আসা
মোহাম্মদ ইউসুফ ১৯৭৪ সালের ২৭ আগস্ট পাকিস্তানের লাহোরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর জন্মনাম ছিল ইউসুফ ইউহানা। শৈশব থেকেই ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহ থাকলেও পেশাদার ক্রিকেটার হওয়ার পথ তাঁর জন্য সহজ ছিল না। পারিবারিক আর্থিক সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা ইউসুফ একসময় জীবিকার তাগিদে ক্রিকেট থেকে দূরে সরে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। পরে আবার খেলায় ফিরে ঘরোয়া ক্রিকেটে নিজের প্রতিভার পরিচয় দেন।
১৯৯৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক হয় তাঁর। একই বছরের ২৮ মার্চ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক ঘটে। শুরুতে ধারাবাহিকতা অর্জনে কিছুটা সময় লাগলেও পরবর্তী সময়ে তিনি পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইনআপের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হয়ে ওঠেন।
২০০৬ সালে রেকর্ড গড়ার বছর
মোহাম্মদ ইউসুফের ক্যারিয়ারের সবচেয়ে স্মরণীয় অধ্যায় ২০০৬ সাল। ওই বছর টেস্ট ক্রিকেটে তিনি ১১টি ম্যাচে ১ হাজার ৭৮৮ রান করেন, যা এক পঞ্জিকাবর্ষে টেস্টে সর্বোচ্চ রানের বিশ্বরেকর্ড। একই বছরে তিনি নয়টি শতক করেন, যা ওই সময়ের জন্য এক পঞ্জিকাবর্ষে টেস্টে সর্বাধিক শতকের রেকর্ডও ছিল।
ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে তিন টেস্টের সিরিজে তিনি ৬৬৫ রান সংগ্রহ করেন। এই পারফরম্যান্সে পাকিস্তানের ব্যাটিং শক্তি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর ধারাবাহিক সাফল্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের নজর কাড়ে। ২০০৭ সালে তিনি আইসিসির বর্ষসেরা টেস্ট খেলোয়াড়ের পুরস্কার অর্জন করেন। ক্রিকেট সাময়িকী উইজডেনও তাঁকে ২০০৭ সালের বর্ষসেরা ক্রিকেটারদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।
টেস্ট ও একদিনের ক্রিকেটে পরিসংখ্যান
টেস্ট ক্রিকেটে ইউসুফ ৯০টি ম্যাচ খেলে ৭ হাজার ৫৩০ রান করেন। তাঁর ব্যাটিং গড় ছিল ৫২ দশমিক ২৯ এবং শতকের সংখ্যা ২৪। টেস্টে তাঁর সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত সংগ্রহ ২২৩ রান।
একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ২৮৮ ম্যাচে তাঁর সংগ্রহ ৯ হাজার ৭২০ রান। এই সংস্করণে তাঁর ব্যাটিং গড় ছিল প্রায় ৪১ দশমিক ৭১। তিনি ১৫টি শতক ও ৬৪টি অর্ধশতক করেন। তাঁর সর্বোচ্চ একদিনের আন্তর্জাতিক ইনিংস ছিল অপরাজিত ১৪১ রান।
২০১০ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে লর্ডসে নিজের শেষ টেস্ট খেলেন তিনি। একই বছরের নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে শেষ একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশ নেন।
অধিনায়কত্ব ও ক্যারিয়ারের শেষ অধ্যায়
পাকিস্তান দলের নেতৃত্বেও দায়িত্ব পালন করেছেন ইউসুফ। ২০০৯ সালে নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া সফরে তিনি দলের অধিনায়কত্ব করেন। তবে অস্ট্রেলিয়া সফরে পাকিস্তানের হতাশাজনক ফলাফলের পর দলটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়।
২০১০ সালের মার্চে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ইউসুফসহ কয়েকজন খেলোয়াড়ের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়। ওই সময় তিনি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। পরে ইংল্যান্ড সফরে আবার পাকিস্তান দলে ফেরেন। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর প্রত্যাবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি।
ক্রিকেটে স্থায়ী উত্তরাধিকার
মোহাম্মদ ইউসুফের ক্রিকেটজীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় তাঁর ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতা ও রেকর্ড গড়ার ক্ষমতা। ২০০৬ সালে এক বছরে ১ হাজার ৭৮৮ টেস্ট রান এবং নয়টি শতক তাঁকে ক্রিকেট ইতিহাসের আলোচিত ব্যাটসম্যানদের সারিতে স্থান দিয়েছে।
তাঁর ক্যারিয়ার দেখায়, প্রতিকূলতা পেরিয়ে দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে প্রতিষ্ঠিত থাকা এবং অসাধারণ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে ইতিহাসে জায়গা করে নেওয়া সম্ভব। পাকিস্তানের হয়ে তাঁর অর্জন এবং রেকর্ডভাঙা ব্যাটিংয়ের জন্য মোহাম্মদ ইউসুফ ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।