Advertisement

অমর কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বারের প্রয়াণ দিবসে কালজয়ী সুরের মূর্ছনায় বিনম্র শ্রদ্ধা

বাংলা সংগীত জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, কোটি মানুষের হৃদয়ের স্পন্দন, কিংবদন্তি শিল্পী আবদুল জব্বার। যাঁর মায়াবী কণ্ঠে ‘ওরে নীল দরিয়া’ আজও আছড়ে পড়ে শ্রোতার মনে, সেই মহান শিল্পী ২০১৭ সালের এই দিনে মরণ সাগরের ওপাড়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন। আজকের দিনটি তাঁর চিরবিদায়ের, কিন্তু সংগীতের ভুবনে তিনি আজও অম্লান। ১৯৩৮ সালের ৭ নভেম্বর কুষ্টিয়ায় জন্ম নেওয়া এই শিল্পী ১৯৫৮ সাল থেকে বেতারে নিজেকে মেলে ধরার পর কখনোই পেছনে ফিরে তাকাননি। জহির রায়হানের ‘সংগম’ থেকে শুরু করে ‘সারেং বৌ’ পর্যন্ত প্রতিটি সিনেমাতেই তিনি যোগ করেছেন সুরের জাদু।

আবদুল জব্বারের কণ্ঠের জাদুতে অমর হয়ে আছে অসংখ্য গান। বিশেষ করে আলম খানের সুরে ‘সারেং বৌ’ চলচ্চিত্রে ‘ওরে নীল দরিয়া’ গানটি বাঙালির আবেগের সমার্থক হয়ে আছে। গানটির পেছনের গল্পটি বেশ চমকপ্রদ। সুরকার আলম খান জানান, ১৯৬৯ সালে গুনগুন করে সুরটি মাথায় এলেও সার্থক রূপ দিতে লেগে যায় বহু বছর। অবশেষে আবদুল্লাহ আল-মামুনের নির্মাণ পরিকল্পনায় মুকুল চৌধুরীর কথায় গানটি পায় পূর্ণতা। রেকর্ডিং স্টুডিওতে ১০ জন বাদ্যযন্ত্রশিল্পীর অনবদ্য আয়োজনে গানটি ধারণ করা হয়, যা বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এক মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আছে।

বিজ্ঞাপন

তবে কেবল বিনোদন নয়, আবদুল জব্বারের নাম জড়িয়ে আছে আমাদের ইতিহাসের সাথেও। ১৯৭১ সালের উত্তাল মার্চে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রেসকোর্স ময়দানের ঐতিহাসিক ভাষণের পর তাঁর গাওয়া ‘সালাম সালাম হাজার সালাম’ হয়ে ওঠে মুক্তিপাগল বাঙালির অনুপ্রেরণার উৎস। যুদ্ধের সেই ভয়াবহ দিনগুলোতে হারমোনিয়াম হাতে ক্যাম্পে ক্যাম্পে ঘুরে তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের মনে সাহস জুগিয়েছেন। নিজের উপার্জিত ১২ লাখ রুপি ত্রাণ তহবিলে দান করে তিনি অনন্য দেশপ্রেমের স্বাক্ষর রেখেছিলেন। এমনকি ভারতের মাটিতে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত তৈরিতেও তাঁর ভূমিকা ছিল অসামান্য।

তাঁর গাওয়া ‘তুমি কি দেখেছ কভু জীবনের পরাজয়’ গানটি নিয়ে খোদ হেমন্ত মুখোপাধ্যায় বলেছিলেন, ‘তুমি বাংলাদেশের জব্বার, তোমার গান আমাকে মোহিত করেছে।’ এই গানটি আজও মঞ্চে গাইলে শ্রোতাদের চোখে জল চলে আসে। অথচ জীবনের শেষ দিনগুলো খুব একটা সুখকর ছিল না এই কিংবদন্তির জন্য। অসুস্থতা আর টানাপোড়েনের মাঝেও তিনি বাঁচার তীব্র আকুতি জানিয়েছিলেন। হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বলেছিলেন, ‘আমি আরও কিছুদিন বাঁচতে চাই।’

বিজ্ঞাপন

কিন্তু नियতির ডাকে ২০১৭ সালের ৩০ আগস্ট সকালে বিএসএমএমইউ হাসপাতালে এই দরাজ কণ্ঠের মানুষটি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরদিন বৃষ্টির দিনে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শেষ বিদায় জানাতে আসা মানুষের ঢল প্রমাণ করেছিল, তিনি কতটা প্রিয় ছিলেন। বৃষ্টির পানি আর অশ্রুধারায় একাকার হয়ে সেদিন জাতি বিদায় জানিয়েছিল তাদের প্রিয় শিল্পীকে। কফিন ফুলে ফুলে ঢেকে গেলেও, আবদুল জব্বারের সুরের সৌরভ আজও আমাদের জাতীয় চেতনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে রয়ে গেছে।

0%
0%
0%
0%