বোয়িংয়ের নিরাপত্তা সংকট ও অন্দরমহলের অজানা অধ্যায় নিয়ে নেটফ্লিক্সের নতুন তথ্যচিত্র ফ্রিফল

আকাশপথের নিরাপত্তা, প্রকৌশলগত নিখুঁত দক্ষতা আর বৈশ্বিক আভিজাত্যের প্রতীক ছিল বোয়িং। কিন্তু সেই সোনালী ভাবমূর্তির অন্তরালে জমে থাকা অন্ধকার আর করপোরেট মুনাফালোভী সংস্কৃতির ভয়ানক রূপ নিয়ে নেটফ্লিক্সে হাজির হয়েছে চাঞ্চল্যকর তথ্যচিত্র ‘ফ্রিফল: আ রেকনিং ফর বোয়িং’। অস্কার মনোনীত নির্মাতা ররি কেনেডির সুদক্ষ পরিচালনায় নির্মিত এই ৯৩ মিনিটের প্রামাণ্যচিত্রটি যেন একাধারে উদ্বেগ আর সত্য উদ্ঘাটনের দলিল।
২০২২ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ডাউনফল: দ্য কেস এগেইনস্ট বোয়িং’-এর পরবর্তী কিস্তি হিসেবে ‘ফ্রিফল’ আরও গভীরে প্রবেশ করেছে। লায়ন এয়ার এবং ইথিওপিয়ান এয়ারলাইনসের ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ৩৪৬ জন প্রাণ হারানোর ঘটনা শুধু শুরু ছিল মাত্র। নতুন এই ছবিতে ররি কেনেডি কেবল প্রযুক্তিগত ত্রুটির ব্যবচ্ছেদ করেননি, বরং বোয়িংয়ের ভেতরকার সেই বিষাক্ত করপোরেট সংস্কৃতিকে ক্যামেরার সামনে এনেছেন, যা আজ যাত্রীদের মনে আস্থার সংকট তৈরি করেছে।
এই তথ্যচিত্রের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বোয়িংয়ের সাবেক কোয়ালিটি কন্ট্রোল কর্মকর্তা জন বার্নেট। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা ত্রুটি নিয়ে বারবার সরব হয়েছিলেন। কিন্তু অশুভ পরিণতির মুখে পড়ে তিনি আইনি লড়াইয়ে নামেন। ২০২৪ সালের মার্চে দক্ষিণ ক্যারোলাইনায় মামলার জবানবন্দি দেওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে বার্নেটের রহস্যজনক মৃত্যু গোটা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিল। কেনেডি মনে করেন, বার্নেটের সাহসী কণ্ঠস্বরই এই প্রামাণ্যচিত্রটিকে কেবল একটি রিপোর্ট নয়, বরং এক অনুসন্ধানী অভিযানে রূপ দিয়েছে।
ছবিটিতে ৭৮৭ ড্রিমলাইনারের উৎপাদন জটিলতা, মান নিয়ন্ত্রণের অবহেলা এবং দ্রুত মুনাফার নেশায় নিরাপত্তাকে বিসর্জন দেওয়ার ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। এমনকি বোয়িংয়ের কর্মীরাই যে নিজের তৈরি বিমানে উঠতে আতঙ্ক বোধ করতেন, সেটিই ছিল প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ সংকটের সবচেয়ে বড় সতর্কবার্তা। এছাড়া আলাস্কা এয়ারলাইনসের দরজার প্লাগ খুলে পড়ার সাম্প্রতিক ঘটনাটিও প্রমাণ করে যে, সংকট কোনো পুরোনো ইতিহাস নয়, বরং চলমান এক বিপর্যয়।
ররি কেনেডি ‘ফ্রিফল’-এর মাধ্যমে একটি কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছেন—ব্যবসায়িক সাফল্যের দৌড়ে যদি নিরাপত্তা দ্বিতীয় সারিতে চলে যায়, তবে তার দায়ভার শেষ পর্যন্ত কার? তিনি কেবল বোয়িংয়ের অতীতকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাননি, বরং করপোরেট মুনাফা এবং জনস্বার্থের মধ্যকার চিরন্তন দ্বন্দ্বকেও উন্মোচিত করেছেন। বিমানশিল্পের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে যেখানে প্রতিটি ভুলের মূল্য জীবনের বিনিময়ে দিতে হয়, সেখানে বোয়িংয়ের এই ‘মুক্তপতন’ কি আদৌ থামার পথ খুঁজে পাবে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই ছবিটি দর্শকদের জন্য এক ভয়াবহ বাস্তবতার দর্পন হয়ে উঠেছে।
