নেটফ্লিক্সের শীর্ষে সোয়াপড রূপকথার জগতে অনন্য এক অ্যাডভেঞ্চার

গত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই অ্যানিমেশন ঘরানার সিনেমা ‘সোয়াপড’ বিশ্বজুড়ে দর্শকের হৃদয়ে আসন গেড়ে নিয়েছে। টানা দশ সপ্তাহ নেটফ্লিক্সের গ্লোবাল টপ চার্টে শীর্ষস্থান ধরে রাখা এই সিনেমাটি এখন পর্যন্ত ১৪ কোটিরও বেশিবার দেখা হয়েছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্মে কোনো অ্যানিমেশন ছবির জন্য এমন দীর্ঘস্থায়ী রাজত্ব নিঃসন্দেহে এক বিশাল অর্জন। ছবির এই অভূতপূর্ব সাফল্যের নেপথ্যে রয়েছে এর নান্দনিক নির্মাণশৈলী, সমৃদ্ধ ভিজ্যুয়াল এবং হৃদয়স্পর্শী গল্প বলার এক অনন্য জাদু।

বিজ্ঞাপন

‘ট্যাঙ্গলড’খ্যাত পরিচালক নাথান গ্রেনোর জন্য ‘সোয়াপড’ ক্যারিয়ারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। দীর্ঘ দেড় দশকের বিরতির পর পূর্ণদৈর্ঘ্য অ্যানিমেশন পরিচালনায় ফিরে তিনি আবারও নিজের মুন্সিয়ানা দেখিয়েছেন। স্কাইড্যান্স অ্যানিমেশনের জন্য এই ছবিটি ছিল নিজেদের অস্তিত্ব ও সামর্থ্য প্রমাণের লড়াই। আগের দুটি প্রজেক্ট—‘লাক’ ও ‘স্পেলবাউন্ড’—প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় ‘সোয়াপড’-এর ওপর ছিল বাড়তি চাপ। তবে সেই চাপ জয় করে সিনেমাটি দর্শকদের এক জাদুকরী জগতে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।

গল্পের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অলি নামের পুকু প্রজাতির একটি কৌতূহলী প্রাণী, যে বংশপরম্পরায় শুনে এসেছে ভ্যালির অন্য প্রাণীরা তাদের চিরশত্রু। কিন্তু কৌতূহলী অলি নিজের চোখে সত্য যাচাই করতে গিয়ে জাভান-আইভির সঙ্গে এক মায়াবী সম্পর্কের সূচনা করে। জাভানদের প্রতি দেখানো অলির সামান্য সহানুভূতিই কাল হয়ে দাঁড়ায় পুকুদের জন্য, যখন জাভানরা তাদের খাদ্যের উৎস দখল করে নেয়। নিজের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে গিয়ে জাদুকরী ফলের স্পর্শে অলি যখন জাভানে রূপান্তরিত হয়, তখন থেকেই শুরু হয় নতুন এক আত্মপরিচয়ের লড়াই। শত্রুর শরীরে বেঁচে থাকতে গিয়েই দুই প্রজাতি আবিষ্কার করে বহুদিনের চাপা পড়ে থাকা এক সত্য।

গল্পের প্রেক্ষাপট কিছুটা পরিচিত মনে হলেও ‘সোয়াপড’-এর আসল শক্তি এর বিশ্ব নির্মাণে। বাস্তবের প্রাণী ও কল্পনার সংমিশ্রণে তৈরি ‘ভ্যালি’ জগত যেন কোনো রূপকথার বইয়ের পাতা থেকে বেরিয়ে আসা এক জীবন্ত ক্যানভাস। সমুদ্র-ভোঁদড়সদৃশ পুকু, প্যাঁচা ও টিয়াপাখির মিশ্রণে তৈরি জাভান কিংবা বিশালকায় ডজো—সব মিলিয়ে পর্দায় যে জগত তৈরি হয়েছে, তা দর্শকদের মুগ্ধ করে রাখে। বিশেষ করে ডজোদের অসামান্য উপস্থিতি হায়াও মিয়াজাকির ‘মাই নেইবার তোতোরো’র মতো কালজয়ী চলচ্চিত্রের কথা মনে করিয়ে দেয়।

বিজ্ঞাপন

সিনেমাটির বড় প্রাপ্তি এর অন্তর্নিহিত বার্তা। শরীর অদল-বদলকে কেবল হাস্যরসের খোরাক হিসেবে ব্যবহার না করে পরিচালক দেখিয়েছেন, অন্যের অবস্থানে না দাঁড়ালে তার কষ্ট অনুভব করা অসম্ভব। এই গভীর দর্শনকে তিনি শিশুদের উপযোগী অ্যাডভেঞ্চারের মোড়কে সহমর্মিতা ও পারস্পরিক বিশ্বাসের গল্পে রূপ দিয়েছেন। এতে কণ্ঠ দিয়েছেন মাইকেল বি জর্ডান, জুনো টেম্পল এবং ট্রেসি মর্গানের মতো তারকারা, যাদের অনবদ্য কণ্ঠের জাদুতে চরিত্রগুলো প্রাণ পেয়েছে। এছাড়া সিদ্ধার্থ খোসলার আবহসংগীত ভ্যালির রহস্যময়তাকে আরও বহুমাত্রিক করে তুলেছে।

চিত্রনাট্যের দ্বিতীয়ার্ধে তাড়াহুড়ো থাকলেও ‘সোয়াপড’ অ্যানিমেশন শিল্পের এক অনন্য দলিল। এটি প্রমাণ করে যে, পরিচিত গল্পকেও যদি যথাযথ যত্ন ও কল্পনার মিশেলে উপস্থাপন করা যায়, তবে তা অনায়াসেই দর্শকদের জয় করতে পারে। বিনোদন ও আবেগের এক দারুণ ভারসাম্য তৈরি করে ‘সোয়াপড’ এখন বিশ্বজুড়ে অ্যানিমেশন প্রেমীদের নতুন আচ্ছন্নতার নাম।

0%
0%
0%
0%