শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে রুনা লায়লার সুরের জাদুতে মুগ্ধ প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম

শ্রাবণের স্নিগ্ধ সন্ধ্যায় প্রকৃতি যখন ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ভিজছিল, তখন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে নেমে এসেছিল সুরের এক মায়াবী বৃষ্টি। উপমহাদেশের কিংবদন্তি সংগীতশিল্পী রুনা লায়লার কণ্ঠের জাদুতে সেদিন সিক্ত হলো উপস্থিত শ্রোতাদের হৃদয়। দীর্ঘ ছয় দশকের বর্ণিল সংগীতজীবনের দীর্ঘ পথচলায় প্রথমবারের মতো শিল্পকলা একাডেমির মূল মঞ্চে একক কনসার্টে অংশ নিলেন এই সুরসম্রাজ্ঞী। ‘শিল্পী আমি তোমাদেরই গান শোনাব’ শিরোনামের এই আয়োজনে দর্শক সারিতে ছিল ২৭ থেকে ৭৭ বছর বয়সী মানুষের অপূর্ব মেলবন্ধন, যেখানে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না।
সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় মঞ্চে উঠে রুনা লায়লা প্রথমেই দেশাত্মবোধক গান ‘দেশের জন্য যারা’ গেয়ে শ্রদ্ধা জানান বাংলা ভাষা ও দেশের বীর সন্তানদের। এরপর একে একে ‘শিল্পী আমি’, ‘যখন থামবে কোলাহল’, ‘গানেরই খাতায়’, ‘বন্ধু তিন দিন’ এবং ‘অনেক বৃষ্টি ঝরে’-এর মতো কালজয়ী সব গানে মঞ্চ মাতিয়ে রাখেন তিনি। প্রথমবারের মতো মঞ্চে পরিবেশন করেন নজরুলের গান ‘ভুলিতে পারি না’। অনুষ্ঠানের শেষভাগে দর্শকদের বিশেষ অনুরোধে যখন ‘দমাদম মাস্ত কালান্দার’ পরিবেশন করেন, তখন পুরো মিলনায়তন যেন এক মোহনীয় আবেশে ডুবে গিয়েছিল।
সংগীতের জাদুকরী পরিবেশনার ফাঁকে রুনা লায়লা ভাগ করে নিলেন তাঁর সুদীর্ঘ ক্যারিয়ারের নানা স্মৃতি। মাত্র ছয় বছর বয়সে করাচিতে মঞ্চে ওঠার সেই আকস্মিক মুহূর্ত থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত দশ সহস্রাধিক গানের নেপথ্যের গল্প শুনিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করেন তিনি। ১৮টি ভাষায় পারদর্শী এই শিল্পী তাঁর সহজাত রসবোধ আর সাবলীল কথোপকথনে অনুষ্ঠানটিকে করে তোলেন প্রাণবন্ত। অভিনেতা আফজাল হোসেনের সঙ্গে আলাপচারিতায় রুনা লায়লার হাস্যোজ্জ্বল উপস্থিতি যেন মনে করিয়ে দিচ্ছিল, সময়ের স্রোতে বয়স বাড়লেও সুরের সাধনায় তিনি আজও চিরসবুজ।
এই অনন্য আয়োজনে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী রুনা লায়লার হাতে বিশেষ সম্মাননা তুলে দেন। অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ামসহ মন্ত্রণালয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। বক্তারা একবাক্যে স্বীকার করেন, রুনা লায়লার শিল্পসাধনা কেবল বাংলা সংগীতকে সমৃদ্ধই করেনি, বরং বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের সম্মানকেও করেছে সমুজ্জ্বল। কিংবদন্তি শিল্পীদের সম্মান জানানোর এমন উদ্যোগের অংশ হিসেবে আয়োজিত এই কনসার্টের টিকিট বিক্রির সমুদয় অর্থ বন্যার্তদের সহায়তায় প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দান করা হবে বলেও জানানো হয়।
রাত সোয়া নয়টায় যখন অনুষ্ঠান শেষ হয়, তখন বাইরে বৃষ্টির রেশ কাটলেও ভেতরে সুরের রেশ যেন রয়েই গিয়েছিল। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের হৃদয়ে গেঁথে থাকা এই কিংবদন্তি শিল্পী প্রমাণ করলেন, প্রকৃত সুরের কোনো বয়স নেই; তা অনন্তকাল টিকে থাকে। শিল্পকলা একাডেমির সেই সন্ধ্যা কোনো সাধারণ কনসার্ট ছিল না, বরং তা ছিল বাংলা গানের এক জীবন্ত কিংবদন্তিকে ঘিরে অগণিত ভক্তের ভালোবাসা আর সংগীতের এক অনবদ্য উদ্যাপন।