না ফেরার দেশে বাংলাদেশের পাপেটম্যান মুস্তাফা মনোয়ার

শিল্পাঙ্গনের এক নক্ষত্রপতন ঘটল আজ। বাংলাদেশের পাপেট শিল্পের রূপকার, বরেণ্য চিত্রশিল্পী এবং সৃজনশীল নির্মাতা মুস্তাফা মনোয়ার না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন। ৯০ বছর বয়সে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে নিউমোনিয়া ও প্রোস্টেট ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করা এই কিংবদন্তি শিল্পী জীবনের শেষ দিনগুলো কাটিয়েছিলেন নিবিড় পর্যবেক্ষণে। তাঁর মৃত্যুতে পুরো সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

মুস্তাফা মনোয়ার মানেই ছিল এক অফুরন্ত বিস্ময়। ‘নতুন কুঁড়ি’র মতো কালজয়ী অনুষ্ঠানের জনক তিনি, আবার শিশুদের প্রিয় ‘মীনা’ চরিত্রের রূপকারও তিনিই। চিত্রশিল্পী হিসেবে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও ছিল তাঁর সুখ্যাতি। সত্যজিৎ রায়ের মতো কিংবদন্তি নির্মাতার কণ্ঠেও ঝরেছিল তাঁর শিল্পকর্মের প্রশংসা। অল্প রেখায় বিশাল ক্যানভাস ফুটিয়ে তোলার জাদুকরী ক্ষমতা ছিল তাঁর তুলিতে। অথচ এই বিপুল প্রতিভার অধিকারী মানুষটি সারাজীবন নিজের ভেতরের শিশুটিকে সযতনে আগলে রেখেছিলেন।

বয়সকে তিনি কেবল সংখ্যার হিসাব বলে মনে করতেন। তাঁর দর্শন ছিল, পৃথিবী এবং জীবনকে ভালোবাসার কোনো বয়স নেই। ২০১৯ সালে নিজের জন্মদিনে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘বয়সটা দুই রকম—অঙ্কের ব্যাপার আর মনের তৃপ্তির ব্যাপার। পৃথিবীকে দেখার ও ভালোবাসার জায়গায় বয়স বাড়ে না।’ জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি এই দর্শনেই অটল ছিলেন। শিল্পের প্রতি প্রবল অনুরাগ আর প্রকৃতিকে দেখার অদম্য কৌতূহল তাঁকে সব সময় তারুণ্যের আলোয় ভাসিয়ে রেখেছিল।

শুধু ছবি আঁকা বা পাপেট শিল্পেই নয়, সঙ্গীতের প্রতিও ছিল তাঁর গভীর অনুরাগ। ওস্তাদ ফাইয়াজ খাঁর শিষ্য সন্তোষ রায়ের কাছে তালিম নেওয়া মুস্তাফা মনোয়ার মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে সাংস্কৃতিক দলের হয়ে গেয়েছেন দেশাত্মবোধক গান। এমনকি ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোতে কার্টুন এঁকে কারাবরণ করেছিলেন তিনি। পাকিস্তান আমলে টেলিভিশনের পর্দায় বাংলা সংস্কৃতিকে জনপ্রিয় করে তোলার নেপথ্যে ছিল তাঁর অসামান্য অবদান। রবীন্দ্রনাথের ‘রক্তকরবী’ কিংবা মুনীর চৌধুরীর ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’—তাঁর নান্দনিক নির্দেশনায় টেলিভিশনের পর্দা হয়ে উঠেছিল সজীব।

বিজ্ঞাপন

মুস্তাফা মনোয়ার আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া সৃষ্টি অমর। তিনি নিজেই শিখিয়ে গেছেন, শিল্প ও সৃজনশীলতায় মানুষ বয়সের গণ্ডি পেরিয়ে চিরতরুণ হতে পারে। ৯০ বছরের দীর্ঘ পথচলায় তিনি শিল্পের ভুবনে যে আলো ছড়িয়ে গেছেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে। যে মানুষটি চিরকাল শিশুমনের মানুষ হয়ে বাঁচতে চেয়েছিলেন, তিনি আজ এক কৌতূহলী স্বপ্নবাজ হিসেবেই চিরস্মরণীয় হয়ে রইলেন।

0%
0%
0%
0%