শিক্ষাক্ষেত্রে অসামান্য অবদান, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং দক্ষ প্রশাসনিক নেতৃত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক-২০২৬-এ দেশের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক (মহিলা) নির্বাচিত হয়েছেন নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ উপজেলার ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বি আর বিলকিস। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের চূড়ান্ত মূল্যায়নে তাকে এই গৌরবময় পদকে ভূষিত করা হয় এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পদক গ্রহণ করেন। সুদীর্ঘ কর্মজীবনে এর আগে তিনি ১২ বার সোনারগাঁ উপজেলার শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক, আটবার নারায়ণগঞ্জ জেলার এবং দুইবার ঢাকা বিভাগের শ্রেষ্ঠ প্রধান শিক্ষক হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিলেন।
ভট্টপুর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে একটি আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তার সুনিপুণ পরিচালনায় বিদ্যালয়টি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বারবার প্রশংসিত হয়েছে। ঝরে পড়া শিক্ষার্থীর হার কমানো, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের সর্বোত্তম ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীদের সহশিক্ষা কার্যক্রমে উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে তিনি অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে ১ হাজার ২০ জন শিক্ষার্থী ও ১৩ জন শিক্ষক রয়েছে। প্রতি রোববার ‘হ্যাপি সানডে’ পালনের পাশাপাশি এখানে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির হার ৯৮ থেকে ৯৯ শতাংশের মধ্যে থাকে। এছাড়া ২০২৫ সালের বৃত্তি পরীক্ষায় বিদ্যালয় থেকে ৩৪ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে ৩০ জনই বৃত্তি লাভ করে।
এই গৌরবময় অর্জনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বি আর বিলকিস জানান, যেকোনো কাজের স্বীকৃতিই আনন্দের এবং এই অর্জন তাঁর বিদ্যালয়ের সকল শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল। তিনি ১৯৯৩ সালে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন এবং পরবর্তীতে ২০০৩ সালে প্রধান শিক্ষক পদে নিয়োগ পান। সোনারগাঁয়ের সাদিপুর ইউনিয়নের কোনাবাড়ি গ্রামে জন্ম নেওয়া এই শিক্ষাবিদ পঞ্চমীঘাট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি, রাজধানীর লালমাটিয়া কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক এবং জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। সততা, নিষ্ঠা ও সময়ানুবর্তিতাকে পুঁজি করে ১৯৯৩ সাল থেকে ২০২৬ সাল—দীর্ঘ এই পথ পাড়ি দিয়েছেন তিনি।
শিক্ষার মানোন্নয়নে বিদ্যালয়ে নানা অভিনব পদ্ধতি ও সহশিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। বছরের শুরুতে তিন স্তরে—উত্তম, মধ্যম ও পিছিয়ে পড়া—শিক্ষার্থী বাছাই করে পিছিয়ে পড়া শিশুদের জন্য বিশেষ ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মান নিশ্চিত করতে বাংলা ক্লাব, গণিত ক্লাব, ইংরেজি ক্লাব ও ভাষা ক্লাব পরিচালনার পাশাপাশি অলিম্পিয়াড এবং বিজ্ঞান মেলার আয়োজন করা হয়। এছাড়া সততা স্টোর, পরামর্শ বক্স, ছাদবাগান এবং প্রতি শনিবার শিক্ষক ও অভিভাবকদের নিয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয়। বিদ্যালয়ের শিক্ষিকা শামীমা আক্তার, মাহামুদা আক্তার ও শিক্ষক কবির হোসেন জানান, প্রধান শিক্ষকের কঠোর পরিশ্রম, শৃঙ্খলা, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মানসিকতা এবং শিক্ষার্থীবান্ধব মনোভাবই এই সাফল্যের মূল চাবিকাঠি। অভিভাবক কেয়া মৌল্লিক মৌমিতা এবং শিক্ষার্থী ফারাজ ইবনে বশিরও প্রধান শিক্ষকের নিয়মিত তদারকি, নৈতিক শিক্ষা এবং আন্তরিক পরিচর্যার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
উল্লেখ্য, প্রতি বছর প্রাথমিক শিক্ষার মাঠপর্যায়ের কাজের গতিশীলতা আনয়ন, মানোন্নয়ন এবং শিক্ষকদের কাজের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার লক্ষ্যে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রদান করা হয়। উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের গণ্ডি পেরিয়ে কঠোর যাচাই-বাছাইয়ের পর জাতীয় পর্যায়ে এই শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারণ করা হয়।