যুক্তরাজ্যের গাড়ির বাজারে চীনা ব্র্যান্ডের অভাবনীয় উত্থান

যুক্তরাজ্যের রাজপথে একসময়ের অচেনা চীনা গাড়িগুলো এখন দৈনন্দিন দৃশ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। বিওয়াইডি এবং গিলির মতো চীনের শীর্ষস্থানীয় অটোমোবাইল ব্র্যান্ডগুলো আধুনিক প্রযুক্তি, সাশ্রয়ী মূল্য এবং উন্নত নির্মাণশৈলীর সমন্বয়ে ব্রিটিশ ক্রেতাদের আস্থা অর্জনে অভাবনীয় সাফল্য দেখিয়েছে। ইউরোপের অন্যান্য বড় বাজারের তুলনায় যুক্তরাজ্য বর্তমানে চীনা বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য অন্যতম প্রধান ও সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
অটোমোটিভ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান মোবিলিটি গ্লোবালের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে যুক্তরাজ্যের বাজারে মাত্র ৩৮৪টি চীনা গাড়ি বিক্রি হয়েছিল। মাত্র পাঁচ বছরের ব্যবধানে ২০২০ সালে সেই সংখ্যা ২৫ হাজার ৩০২-এ উন্নীত হয়। গত বছরের হিসাব অনুযায়ী, এই সংখ্যা দুই লাখ ৮৫ হাজার ছাড়িয়ে গেছে, যা প্রমাণ করে যে গত এক দশকে দেশটির বাজারে চীনা গাড়ির চাহিদা কয়েক শ গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
লন্ডনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের মেইডস্টোনের লিপসকম্ব কার্স বিক্রয়কেন্দ্রের মতো স্থানগুলোতে ক্রেতাদের উপচেপড়া ভিড় চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রতিফলন। ক্রেতাদের মতে, প্রতিষ্ঠিত অনেক পশ্চিমা ব্র্যান্ডের তুলনায় চীনা গাড়িগুলো একই মূল্যে অনেক বেশি প্রযুক্তিগত সুবিধা ও আরামদায়ক অভিজ্ঞতা প্রদান করছে। গাড়িগুলোর নিখুঁত ফিনিশিং এবং শব্দহীন সচলতা ব্যবহারকারীদের মুগ্ধ করছে, যা বিক্রয়কেন্দ্রগুলোতে ক্রেতাদের আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছে।
চীনের অভ্যন্তরীণ বাজারে নতুন গাড়ির চাহিদা কমে যাওয়ায় উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমানে রপ্তানির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করছে। চায়না অ্যাসোসিয়েশন অব অটোমোবাইল ম্যানুফ্যাকচারার্সের দেওয়া তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথমার্ধে চীনের খুচরা বাজারে গাড়ি বিক্রি ২৬ শতাংশ হ্রাস পেলেও রপ্তানি বেড়েছে ৭২ শতাংশ। বিশেষ করে বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রসারে যুক্তরাজ্যের নমনীয় শুল্ক নীতি চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য একটি বড় ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরি করেছে।
দামের প্রতিযোগিতায় পশ্চিমা ব্র্যান্ডগুলো অনেকটা পিছিয়ে পড়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্যে একটি জার্মান ফক্সভাগেন টিগুয়ান প্লাগ-ইন হাইব্রিডের চেয়ে একটি চীনা বিওয়াইডি সিল ইউ মডেলের দাম প্রায় ১০ হাজার পাউন্ড কম। অনেক পশ্চিমা কোম্পানি চীন সরকারের ভর্তুকির কারণে অস্বাভাবিক মূল্যহ্রাসের অভিযোগ তুললেও, গুণগত মান এবং আধুনিক প্রযুক্তির উৎকর্ষতার কারণে বাজারে চীনা গাড়ির এই জয়যাত্রা অব্যাহত রয়েছে।
অটোমোটিভ গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বেঞ্চমার্কের বিশ্লেষক উইল রবার্টসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, লন্ডনের রাস্তায় এখন চীনা গাড়ির উপস্থিতি এতটাই সাধারণ যে তা আর বিস্ময় জাগায় না। জেনারেল মোটরসের সাবেক পর্ষদ সদস্য জন ম্যাকনিল মনে করেন, ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলোর চেয়েও উন্নত প্রযুক্তি এবং প্রতিযোগিতামূলক মূল্যের কারণে চীনা গাড়িগুলো বিশ্ববাজারে শক্ত ভিত গড়েছে। ক্রেতারা এখন কেবল কম দামের টানে নয়, বরং গাড়ির নকশা ও নির্মাণশৈলী যাচাই করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।