রাজকীয় বিলাস থেকে বিশ্ববাজার আইসক্রিম শিল্পের এক দীর্ঘ বিবর্তন ও বাণিজ্যিক যাত্রা

তীব্র দাবদাহে স্বস্তির নিঃশ্বাস হয়ে ওঠা আইসক্রিম বর্তমান বৈশ্বিক খাদ্য শিল্পের অন্যতম আকর্ষণীয় পণ্য। রাজপ্রাসাদের বিলাসিতার গণ্ডি পেরিয়ে বাণিজ্যিক বিপ্লবের হাত ধরে আজ এটি কোটি মানুষের প্রিয় ডেজার্টে পরিণত হয়েছে। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকে প্রাচীন চীনে উদ্ভাবিত বরফ ও দুধের মিশ্রণ থেকে শুরু করে আজকের অত্যাধুনিক প্রক্রিয়াজাত আইসক্রিম শিল্পের বিবর্তন এক দীর্ঘ ও রোমাঞ্চকর পথপরিক্রমা।
ঐতিহাসিক তথ্যানুসারে, রোমান সম্রাট নিরোর শাসনামলে বরফের সঙ্গে ফলের রস ও মধুর সংমিশ্রণে এক ধরনের হিমায়িত খাবার তৈরি করা হতো। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে বিখ্যাত পর্যটক মার্কো পোলো চীন থেকে ইতালিতে রেসিপি নিয়ে আসার পর থেকেই এই খাদ্য ইউরোপীয় অভিজাত মহলে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত এটি ছিল কেবল উচ্চবিত্তের বিলাসিতা, যা সাধারণ মানুষের কাছে ছিল ধরাছোঁয়ার বাইরের এক স্বপ্ন।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে প্রযুক্তির উদ্ভাবন আইসক্রিম শিল্পে আমূল পরিবর্তন আনে। ১৮৪৬ সালে ন্যান্সি জনসন হাতল ঘোরানো ফ্রিজার আবিষ্কার করলে উৎপাদন প্রক্রিয়ায় গতি আসে এবং ১৮৫১ সালে জ্যাকব ফুসেল বাল্টিমোরে বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক আইসক্রিম কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে রেফ্রিজারেশন ও কোল্ড স্টোরেজ প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি বিংশ শতাব্দীতে আইসক্রিমকে বিশ্বব্যাপী সাধারণ ক্রেতার নাগালে পৌঁছে দেয়।
১৯৮৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যান জুলাই মাসকে জাতীয় আইসক্রিম মাস এবং মাসের তৃতীয় রোববারকে বিশেষ দিবস হিসেবে ঘোষণা করলে এটি বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছায়। এই দিবসটি মূলত আইসক্রিম শিল্পের সঙ্গে জড়িত উদ্যোক্তা ও কর্মীদের অবদানের স্বীকৃতি প্রদানের পাশাপাশি এই মিষ্টি শিল্পের বাণিজ্যিক প্রসারকে উদ্যাপন করে। দিনটির উদ্দেশ্য হলো পরিবার ও বন্ধু-বান্ধবদের মধ্যে আইসক্রিমের মাধ্যমে পারস্পরিক আনন্দ ভাগ করে নেওয়া।
বাংলাদেশে আইসক্রিমের বাণিজ্যিক যাত্রা শুরু হয় ষাটের দশকে ‘ইগলু’র হাত ধরে, যদিও এর আগে দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি কুলফি ও মালাই বরফ ছিল জনপ্রিয়তার শীর্ষে। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে ‘পোলার’ বাজারে প্রবেশ করলে আইসক্রিম শিল্পে সুস্থ প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। নব্বইয়ের দশকের পর থেকে স্বাদে ও মানে ব্যাপক বৈচিত্র্য আসায় বর্তমানে দেশের আইসক্রিম বাজার অত্যন্ত সম্ভাবনাময় ও প্রতিযোগিতাপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে। বিলাসী রাজকীয় পানীয় থেকে আজকের শিল্পে রূপান্তর আইসক্রিমের বাণিজ্যিক অগ্রযাত্রার এক চমৎকার দৃষ্টান্ত।