বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের নিয়ন্ত্রণ এখন চীনের হাতে: তেলের দামে বড় প্রভাবকের ভূমিকায় বেইজিং

হরমুজ প্রণালিতে ভূ-রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং পারস্য উপসাগরে ইরানের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বিশ্ব জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। তবে এই বাজারের ভবিষ্যৎ এখন কেবল উপসাগরীয় সরবরাহ বা ওপেকের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না, বরং বিশ্বের বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ চীনের কৌশলী অবস্থানের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। তেলের আন্তর্জাতিক দর ওঠানামায় চীনের চাহিদার ধরন বর্তমানে বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্ময়কর নিয়ামকে পরিণত হয়েছে।
চলতি বছরের বসন্তকাল থেকেই চীন বিশ্ববাজার থেকে তেল কেনা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দিয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল এনার্জি এজেন্সির তথ্যমতে, দেশটিতে তেল আমদানির এই হার গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে, যা বাজার বিশ্লেষকদের কাছে এক রহস্য। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, চীন বর্তমানে তাদের বিশাল কৌশলগত মজুত থেকে তেল ব্যবহার করছে অথবা তাদের পরিবহন ও শিল্প খাতে কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে তেলের ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে এনেছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাপক প্রসার এবং উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্কের কারণে দেশটির অভ্যন্তরে জ্বালানির চাহিদা হ্রাস পাওয়াও এই পরিস্থিতির অন্যতম কারণ।
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার অন গ্লোবাল এনার্জি পলিসির জ্যেষ্ঠ গবেষক ক্যারেন ইয়াংয়ের মতে, চীনের চাহিদাই এখন বিশ্ব বাজারের গতিপ্রকৃতি নির্ধারণ করছে। দেশটি যতদিন তেল কেনা থেকে বিরত থাকবে, তেলের দাম ততটাই নিম্নমুখী থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চীনের সাম্প্রতিক কিছু কার্যকলাপে পুনরায় তেল সংগ্রহের আগ্রহের ইঙ্গিত মিলছে, যা বাজারে নতুন করে অস্থিরতার শঙ্কা তৈরি করেছে। এদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা এবং শোধনাগার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বিষয়টিও জ্বালানি পণ্যের পাইকারি বাজারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অটোমোবাইল সংগঠন ট্রিপল-এ এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে গত সপ্তাহে ডিজেলের গড় দাম ২ দশমিক ৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রতি গ্যালন ৪ দশমিক ৮৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। জ্বালানি বাজারের এই নাজুক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র হরমুজ প্রণালিতে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করেছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, প্রণালির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র নিজেই এখন এর অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে এবং নিরাপত্তা বাবদ কার্গোগুলো থেকে মাশুল আদায়ের বিষয়টি খতিয়ে দেখছে। যদিও এই ধরনের পদক্ষেপের আইনি বৈধতা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্ক রয়েছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত, ঐতিহাসিকভাবে ওপেকের মতো উৎপাদক গোষ্ঠীর হাতে বাজারের নিয়ন্ত্রণ থাকলেও বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন। ইউরেশিয়া গ্রুপের বিশ্লেষক গ্রেগরি ব্রু মনে করেন, বর্তমান বিশ্ব বাজারে সৌদি আরব বা যুক্তরাষ্ট্রের চেয়েও চীনের প্রভাব অনেক বেশি শক্তিশালী। চীন তার অভ্যন্তরীণ কৌশল ও মজুত ব্যবহারের মাধ্যমে যেভাবে বৈশ্বিক চাহিদাকে প্রভাবিত করছে, তা সমসাময়িক জ্বালানি অর্থনীতির অন্যতম বড় অঘোষিত সত্য। ওমান উপকূল দিয়ে মার্কিন সামরিক পাহারায় তেল পরিবহনের এই ধারা ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর থাকবে, তা এখন আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তার অন্যতম বড় প্রশ্নের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।