আফগানিস্তানের চালের বাজারে আধিপত্য বিস্তারে ভারতের নতুন কৌশল

আফগানিস্তানের চালের বাজারে নিজেদের অবস্থান সুসংহত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ভারত। দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অংশীদার পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি এবং আঞ্চলিক সংঘাতের সুযোগ নিয়ে কাবুলের বাজারে সরাসরি বাসমতী চাল রপ্তানির উদ্যোগ নিয়েছে নয়াদিল্লি। ইতিমধ্যে দুই দেশের সরকারি পর্যায়ে প্রাথমিক আলোচনা সম্পন্ন হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক বাণিজ্যে এক নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
পাকিস্তানের স্থানীয় গণমাধ্যম দ্য এক্সপ্রেস ট্রিবিউন ও ভারতের দ্য হিন্দু সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত বন্ধ থাকা ও বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ায় পাকিস্তান বর্তমানে বড় ধরনের বাণিজ্যিক সংকটের মুখে পড়েছে। পাকিস্তানের বাণিজ্যসচিব জাওয়াদ পল জানিয়েছেন, আঞ্চলিক অস্থিরতার কারণে দেশটির রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের ধস নেমেছে। শুধু সীমান্ত বন্ধ থাকার কারণেই পাকিস্তান প্রায় ১১০ কোটি ডলারের রপ্তানি ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে আরও ২০০ কোটি ডলারের বাণিজ্য সংকুচিত হয়েছে।
মূলত আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতের তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যের বাসমতী চালের কাছে বাজার হারাচ্ছে পাকিস্তান। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় বাসমতী চাল প্রতি টন ১ হাজার ১০০ ডলারে বিক্রয় হলেও পাকিস্তানের একই মানের চালের দাম পড়ছে প্রায় ১ হাজার ৩০০ ডলার। দামের এই বিশাল পার্থক্যের কারণে পাকিস্তানের খাদ্যপণ্য রপ্তানি প্রায় ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা দেশটির জাতীয় অর্থনীতিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
আফগানিস্তানের বাজারে প্রতি বছর বাসমতী চালের চাহিদা প্রায় পাঁচ লাখ টন। এতদিন ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে পাকিস্তান এই বাজারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখলেও বর্তমান পরিস্থিতি ভিন্ন দিকে মোড় নিয়েছে। আফগান ব্যবসায়ীরা এখন দুবাই বা ইরানের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ভারতীয় চাল কেনার পরিবর্তে সরাসরি ভারত থেকে আমদানির পথ খুঁজছেন। এতে পরিবহন ও মধ্যস্বত্বভোগীদের ব্যয় কমিয়ে আমদানিকৃত চালের দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সরাসরি বাণিজ্যের অংশ হিসেবে ইরানের বন্দর আব্বাস ব্যবহারের প্রস্তাবটি বর্তমানে গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনার টেবিলে রয়েছে। ভারতীয় বাসমতী চালের আমদানি বাড়াতে নয়াদিল্লিতে অবস্থানরত আফগান কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। উভয় দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সম্ভাব্য বৈঠকে পরিবহন ব্যবস্থা, অর্থ পরিশোধ পদ্ধতি ও পণ্যবিনিময় ব্যবস্থা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার পরিকল্পনা রয়েছে। ভারত বর্তমানে আফগানিস্তান থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে শুকনা ফল আমদানি করে থাকে, তাই পণ্যবিনিময়ভিত্তিক বাণিজ্যের সুযোগ এখানে অত্যন্ত উজ্জ্বল।
আফগানিস্তানে ভারতের বাসমতী চালের বাজার সম্প্রসারণের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। ২০২০-২১ অর্থবছরে ভারত আফগানিস্তানে সর্বোচ্চ ১৯ হাজার ৪৪০ টন বাসমতী চাল রপ্তানি করেছিল, যার মূল্য ছিল প্রায় ১০৮ কোটি ৯০ লাখ রুপি। তবে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের বর্তমান বাণিজ্যিক টানাপোড়েন এবং ভারতের সক্রিয় তৎপরতায় এই রপ্তানির পরিমাণ বহুগুণ বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছেন বাণিজ্য বিশ্লেষকরা। এতে দীর্ঘদিনের পাক-আধিপত্য ভেঙে কাবুলের বাজারে ভারতের শক্তিশালী অর্থনৈতিক অবস্থান তৈরির পথ সুগম হতে পারে।