আবাসন কি মৌলিক অধিকার নাকি বিনিয়োগের সম্পদ: লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধির মুখে বিশ্বজুড়ে নতুন বিতর্ক

বিশ্বজুড়ে আয়ের তুলনায় বাড়িভাড়া ও আবাসন মূল্য লাগামহীনভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় পশ্চিমা দেশগুলোতে এক তীব্র সংকট তৈরি হয়েছে, যা নীতিপ্রণেতাদের সামনে এক মৌলিক প্রশ্ন দাঁড় করিয়েছে—আবাসন কি মানুষের মৌলিক অধিকার, নাকি কেবলই একটি লাভজনক বিনিয়োগ মাধ্যম? ২০২৬ সালের মে মাসে যুক্তরাজ্যের ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে ‘নো-ফল্ট’ বা বিনা কারণে উচ্ছেদ বন্ধে এক যুগান্তকারী ভাড়াটিয়া অধিকার আইন কার্যকর হয়েছে। একই সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিত করতে এবং বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের দৌরাত্ম্য রুখতে নানা আইনি ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, লন্ডন থেকে টরন্টো কিংবা বার্লিন থেকে সিডনি—সবখানেই আবাসন মূল্য ও ভাড়ার হার সাধারণ মানুষের আয়ের চেয়ে দ্রুত বাড়ছে। এর ফলে তরুণ প্রজন্ম নিজস্ব বাড়ি কেনার স্বপ্ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং তীব্র আর্থিক চাপের মুখোমুখি হচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘দ্য শিফট’-এর বৈশ্বিক পরিচালক লেইলানা ফারহা জানান, বিংশ শতকের সত্তরের দশকের শেষভাগ ও আশির দশকের শুরুতে নয়া-উদারবাদী নীতি গ্রহণের পর থেকেই মূলত সামাজিক আবাসনে সরকারি বরাদ্দ কমানো শুরু হয়, যা বর্তমান সংকটের মূল ভিত্তি তৈরি করেছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী একটি পরিবারের মোট আয়ের ৩০ শতাংশের বেশি বাসস্থান বাবদ ব্যয় হলে তাকে ‘অসাশ্রয়ী’ আবাসন হিসেবে বিবেচনা করে জাতিসংঘ মানব বসতি কর্মসূচি বা ইউএন-হ্যাবিট্যাট। অন্যদিকে, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা বা ওইসিডি আরও কঠোর পরিমাপক ব্যবহার করে জানায়, কোনো পরিবার যদি তাদের ব্যয়নযোগ্য আয়ের ৪০ শতাংশের বেশি আবাসনে খরচ করে, তবে তা চরম সংকটজনক। বর্তমানে বিশ্বের প্রধান প্রধান শহরগুলোতে এই সীমা পেরিয়ে মানুষ আয়ের সিংহভাগ বাড়িভাড়া ও বন্ধকি ঋণের পেছনে ব্যয় করতে বাধ্য হচ্ছে, যা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পুষ্টির মতো অন্যান্য মৌলিক চাহিদাকে সংকুচিত করছে।
ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পশ্চিমা সরকারগুলো আবাসনকে সামাজিক কল্যাণ হিসেবে দেখত। ১৯১৯ সালে যুক্তরাজ্যের অ্যাডিসন অ্যাক্ট, ১৯৩৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় আবাসন আইন এবং ১৯৬০ সালে সিঙ্গাপুরের হাউজিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বোর্ড গঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সাশ্রয়ী আবাসনের বিকাশ ঘটেছিল। ১৯৫৭ সালে যুক্তরাজ্যে একটি গড় বাড়ির দাম ছিল বার্ষিক আয়ের মাত্র ৪ গুণ, যা ২০২২ সালের নভেম্বরের মধ্যে বেড়ে দাঁড়িয়েছে বার্ষিক আয়ের ৯ গুণ। একই চিত্র যুক্তরাষ্ট্রেও দেখা গেছে, যেখানে ১৯৯০-এর দশকে মূল্য ও আয়ের অনুপাত ৩.২ থাকলেও ২০২৪ সালে তা ৫.০-এ উন্নীত হয়েছে।
বিগত কয়েক দশকে সরকারি নীতিতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, যেখানে সামাজিক আবাসন নির্মাণের চেয়ে বেসরকারি উন্নয়নকারীদের কর ছাড় ও ভাউচার দেওয়াকে প্রধান্য দেওয়া হয়েছে। ওইসিডির ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে সদস্য দেশগুলোতে আবাসন খাতে পাবলিক বিনিয়োগ প্রায় ৯০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। এই শূন্যতার সুযোগ নিয়ে বড় বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী ও বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলো আবাসিক রিয়েল এস্টেট খাতে বিপুল পুঁজি বিনিয়োগ করছে, যার ফলে কেবল মুনাফা অর্জনের লক্ষ্যেই কৃত্রিমভাবে ভাড়া ও আবাসন মূল্য বাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে।
এই সংকটের মুখে নেদারল্যান্ডসের প্রধানমন্ত্রী রব জেটেন প্রতি বছর ১ লাখ নতুন ঘর তৈরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন, একটি দেশের প্রতিটি প্রাণীর মাথার ওপর ছাদ থাকলেও শিক্ষার্থীরা একটি সাশ্রয়ী থাকার জায়গা পাচ্ছে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও রিয়েল এস্টেট বাজারের এই প্রাতিষ্ঠানিক আগ্রাসন রোধে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক বিশেষ নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন, যাতে বড় কর্পোরেশনগুলো সাধারণ ক্রেতাদের বাদ দিয়ে একক পরিবার উপযোগী বাড়িগুলো কিনে নিতে না পারে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে, দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা এবং আবাসনকে বিনিয়োগের পণ্যের পরিবর্তে মানবাধিকার হিসেবে বিবেচনা না করলে কেবল নতুন ভবন নির্মাণ করে এই বৈশ্বিক আবাসন বৈষম্য দূর করা সম্ভব নয়।