বলিভিয়ায় আর্থিক অস্থিরতা ও নীতিগত দাবিতে উত্তাল বিক্ষোভ

বলিভিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী লা পাজ এবং এর পার্শ্ববর্তী এল আল্টোতে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও অনুদান বাতিলের প্রতিবাদে ব্যাপক শ্রমিক বিক্ষোভের তৃতীয় দিনে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে তীব্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। আন্দোলনকারীরা অনুদান বাতিলের ফলে যানের ক্ষতিপূরণের দাবিতে সরব হয়েছেন। দেশটির সর্ববৃহৎ ট্রেড ইউনিয়ন, বলিভিয়ান ওয়ার্কার্স সেন্টার (সিওবি), গত শুক্রবার থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে, যা আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবসের বৈশ্বিক শ্রমিক সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে মিলে গেছে।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার সিওবি-র ডাকে পরিবহন ও শিক্ষা খাতের কর্মীরা রাস্তায় নেমে আসেন, যার ফলে পুলিশের সাথে সংঘর্ষ বাঁধে। লা পাজে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের কাছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিক্ষোভকারীদের ওপর কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এল আল্টোতে সরকারি কর্মীরা বাস, গাড়ি ও ট্রাক দিয়ে রাস্তা অবরোধ করে রাখেন। এই বিক্ষোভে দেশের প্রধান প্রধান শহর, যেমন লা পাজ, এল আল্টো, কোচাবাম্বা, ওরুরু এবং সাংবিধানিক রাজধানী সুকরেতে জনপরিবহন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। বলিভিয়া হাইওয়ে অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, দেশজুড়ে অন্তত ৭০টি সড়ক অবরোধ সৃষ্টি হয়েছে।

মূলত বহু দশকের পুরোনো জ্বালানি তেলের অনুদান বাতিল করায় এই বিক্ষোভের সূত্রপাত। গত বছর দেশের মধ্য-ডানপন্থী রাজনীতিবিদ রদ্রিগো পাজ প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর এই অনুদান বাতিল করেন, যার ফলে ২০০৬ সালের পর প্রথমবারের মতো তেলের মূল্য উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায়। আগে এক লিটার ডিজেল ৩.৭২ বলিভিয়ানো (প্রতি গ্যালন ২.০৬ ডলার) এবং প্রিমিয়াম পেট্রোল ৩.৭৪ বলিভিয়ানো (প্রতি গ্যালন ২.০৫ ডলার) দরে বিক্রি হলেও, অনুদান বাতিলের পর ডিজেল ৯.৮০ বলিভিয়ানো (প্রতি গ্যালন ৫.৪০ ডলার) এবং প্রিমিয়াম পেট্রোল ৬.৯৬ বলিভিয়ানো (প্রতি গ্যালন ৩.৮৪ ডলার) দরে বিক্রি হচ্ছে।

পরিবহন শ্রমিকরা অভিযোগ করেছেন যে, নিম্নমানের জ্বালানি ব্যবহার করতে বাধ্য হওয়ায় তাদের গাড়ি, ট্রাক ও বাসের ইঞ্জিন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তারা সরকারের কাছে এই ক্ষতির জন্য ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন। এছাড়া তারা তেল পাম্পে স্বল্প সময় লাইনে দাঁড়ানো এবং সড়ক মেরামতের দাবিও জানিয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

দক্ষিণ আমেরিকার এই দেশটি গত ৪০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি। বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র ঘাটতি এবং বাজেট ঘাটতি এই সংকটের কারণ। প্রেসিডেন্ট পাজ ক্ষমতায় আসার সময় দেশের মোট ঋণ জিডিপি-র ৯৫ শতাংশ ছিল এবং ২০১৪ সালের পণ্যের দরপতনের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে ঘাটতি চলছিল। অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আনতে গত ফেব্রুয়ারিতে সরকার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)-এর কাছে ৩.৩ বিলিয়ন ডলার আর্থিক সহায়তার অনুরোধ জানায়। মার্চ মাস নাগাদ দেশটির অর্থমন্ত্রী ডলার বন্ড কুপন পরিশোধের কথা জানান, যার ফলস্বরূপ মুডি’স বলিভিয়ার ক্রেডিট রেটিং বাড়িয়ে দেয়।

তবে, মার্চে বলিভিয়ার মুদ্রাস্ফীতি ১৫ শতাংশে পৌঁছেছে, যা গত জুলাইয়ের ২৫ শতাংশ শীর্ষমাত্রা থেকে ১০ শতাংশ কম। একই সময়ে, শিক্ষকরাও রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে একটি “একক বিনামূল্যে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থা” চালুর দাবিতে আন্দোলন করছেন।

সিওবি-এর সাধারণ সম্পাদক মারিও আর্গোলো শুক্রবার এক হাজার সমর্থকের সমাবেশে ঘোষণা করেন, “আজ থেকে অনির্দিষ্টকালের সাধারণ ও সক্রিয় ধর্মঘট পালিত হবে, যতক্ষণ না সরকার জনগণের দাবি বুঝতে পারে।” তাদের দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে মাসিক ন্যূনতম মজুরি ২০ শতাংশ বৃদ্ধি করা। বর্তমানে এটি ৩,৩০০ বলিভিয়ানো (৪৭৭.৭১ ডলার) এবং ২০২৫ সাল থেকে তা ২,৭৫০ বলিভিয়ানো (৩৯৮ ডলার) থেকে বৃদ্ধি পেয়ে জানুয়ারি মাস থেকে কার্যকর হয়েছে। এছাড়া তারা পেনশন বৃদ্ধি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন কমানোরও দাবি জানিয়েছেন।

তবে প্রেসিডেন্ট পাজ গত সপ্তাহে এই দাবিগুলো প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, “যদি আপনারা বেতন বাড়াতে চান, তাহলে প্রথমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করুন।”

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

0%
0%
0%
0%