হাদি হত্যায় নেপথ্যে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিকল্পনাকারীর সন্ধান চলছে তদন্তে

হাদি হত্যাকাণ্ডের দীর্ঘ ও জটিল তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, রাজনৈতিক কর্মী বা ভোটার পরিচয়ে ঘাতক চক্র হাদির গতিবিধি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা কয়েক দিন আগে থেকেই পর্যবেক্ষণ করছিল। এই হত্যাকাণ্ডের প্রধান শুটার হিসেবে চিহ্নিত ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ এবং মোটরসাইকেলচালক মোহাম্মদ আলমগীর শেখ ঘটনার পরপরই সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে ২০২৬ সালের মার্চ মাসে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ টাস্কফোর্স তাদের বনগাঁ সীমান্ত এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করে।
তদন্তকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকার সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে হাদির সাথে ৭-৮ জনের একটি গোপন বৈঠকে ফয়সালের উপস্থিতি ছিল, যা মূলত হামলার চূড়ান্ত প্রস্তুতির অংশ ছিল। ১২ ডিসেম্বর দুপুর ১২টা ৪৯ মিনিটে হাদি মতিঝিল ওয়াপদা মসজিদে জুমার নামাজে প্রবেশ করলে ঘাতকরা বাইরে অবস্থান নেয়। প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা পর্যবেক্ষণের পর হাদি অটোরিকশায় উঠলে তারা তাঁকে অনুসরণ করে এবং দুপুর ২টা ২৪ মিনিটে বক্স কালভার্ট রোডের ডিআর টাওয়ারের সামনে ফয়সাল তাঁকে গুলি করেন।
গুরুতর আহত হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ও পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুরে নেওয়ার পর ১৮ ডিসেম্বর রাত ১০টার দিকে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এই হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে যুবলীগ নেতা মো. তাইজুল ইসলাম বাপ্পীকে অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তথ্যানুযায়ী, বাপ্পী ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বর থেকে কলকাতায় অবস্থান করছেন এবং পরিচয় গোপন রাখতে তিনি মো. মহিউদ্দিন চৌধুরী নামে আধার ও প্যান কার্ড সংগ্রহ করেছেন।
সিআইডির তদন্তে উঠে এসেছে, হামলাকারীদের ভারতে পালাতে দেশীয় মানব পাচারকারী ও চোরাকারবারি চক্র সহায়তা করেছিল। ভারতীয় নাগরিক ফিলিপ সাংমাসহ একটি চক্র তাদের সীমান্ত পারাপার ও আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে। বর্তমানে ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন, যা থেকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা ও অস্ত্র সরবরাহকারীদের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে আসামিদের বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা বর্তমানে বড় আইনি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও, ভারতে আটক আসামিদের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা থাকায় সরাসরি হস্তান্তরে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকায় মানবাধিকার সংক্রান্ত আইনি প্রশ্নের কারণে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হচ্ছে। এসব আইনি ও কূটনৈতিক জটিলতার কারণে সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা এ পর্যন্ত ১৮ বার পিছিয়েছে।
বর্তমানে সিআইডি হত্যাকাণ্ডের মূল নির্দেশদাতা, অর্থের উৎস, অস্ত্র সরবরাহকারী এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের শনাক্ত করতে অধিকতর তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এই অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত সত্যতা কেবল আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। সর্বশেষ ২০ আগস্ট প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য থাকলেও তা সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি।
