চট্টগ্রামে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি উদ্বেগজনক ছয় মাসে হত্যা ও চাঁদাবাজির দাপট অব্যাহত

চট্টগ্রামের রাউজান উপজেলাসহ পুরো জেলায় আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। নির্বাচিত সরকার গঠনের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও থামছে না সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, চাঁদাবাজি ও হত্যাকাণ্ডের মিছিল। পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত সারা দেশে ১ হাজার ৭৮৯টি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে, যা দৈনিক গড়ের হিসাবে প্রায় ১০টি। এর মধ্যে চট্টগ্রাম রেঞ্জে ৩৬১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, যা দেশজুড়ে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
রাউজানের পরিস্থিতি স্থানীয় পর্যায়ে সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিগত ২৩ মাসে এই উপজেলায় ২৮টি খুনের ঘটনা ঘটেছে, যার মধ্যে ১৮ জনই রাজনৈতিক কর্মী। বিশেষ করে অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও এলাকা নিয়ন্ত্রণের জেরে এসব হত্যাকাণ্ডের ১৫টিই সংঘটিত হয়েছে প্রকাশ্য দিবালোকে জনসমাগমের মধ্যে। এছাড়া আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাব মতে, চলতি বছরের প্রথম সাত মাসে সারা দেশে গণপিটুনিতে ১৩৪ জন নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে ৩১ জনই চট্টগ্রামের বাসিন্দা।
ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের জন্য চরম অস্বস্তির নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে চাঁদাবাজি। চলতি বছরের আগস্ট থেকে মে পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরে ৬৮টি চাঁদাবাজির মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। অক্সিজেন, বালুচরা, চান্দগাঁও ও বাকলিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ৪০টির বেশি গোলাগুলির ঘটনা ঘটেছে। গত ১৩ জুলাই বাকলিয়ায় একটি ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে সাড়ে ৩৫ লাখ টাকা লুটের ঘটনা পুরো নগরীতে আতঙ্কের জন্ম দেয়। এর কয়েকদিন আগে থেকেই ব্যবসায়ীর কাছে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল।
শুধু ব্যবসায়ীরাই নন, সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারাও সন্ত্রাসীদের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন। গত এক বছরে চট্টগ্রামে অন্তত ১০টি সরকারি দপ্তরে হামলা, ভাঙচুর ও সশস্ত্র মহড়ার ঘটনা ঘটেছে, যার অর্ধেকই ঘটেছে গত ছয় মাসে। গত ২১ জুন স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম কার্যালয়ে হামলা ও ১৮ জুন শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীকে অস্ত্র ঠেকিয়ে প্রাণনাশের হুমকির মতো ঘটনাগুলো প্রশাসনিক দুর্বলতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে।
রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থাকা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলো বেপরোয়া হয়ে ওঠায় পরিস্থিতি জটিলতর হচ্ছে বলে মনে করছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি আখতার কবির চৌধুরী। তার মতে, প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে নিরপেক্ষ দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করতে হবে। তবে মাঠ পর্যায়ের এই অস্থিরতায় ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এবং অনেকেই ভয়ে আইনি সহায়তা নিতেও নিরুৎসাহিত হচ্ছেন।
এদিকে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশি অভিযানের দাবি জানানো হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। চকবাজারের চন্দনপুরা এলাকায় পুলিশি পাহারায় ব্যবসায়ীর বাড়িতে হামলা কিংবা জনবহুল বাজারে যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে গুলি করে হত্যার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় ভুক্তভোগী পরিবার ও সাধারণ মানুষ।
