কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে গিয়ে গত এক সপ্তাহে অগ্নিকাণ্ড এবং পানিতে ডুবে নারী ও শিশুসহ অন্তত ১৪ জন পর্যটকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে মেরিন ড্রাইভের পাটুয়ারটেক এলাকায় টুপটুপ রিসোর্টে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র আলোড়ন তুলেছে। এই ধারাবাহিক অপ্রীতিকর ঘটনা ও প্রাণহানির প্রেক্ষাপটে দেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারের সার্বিক নিরাপত্তা, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং প্রশাসনের তদারকি ঘাটতি নিয়ে জোরালো প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, আলোচিত টুপটুপ রিসোর্টটির কোনো বৈধ অনুমোদন ছিল না এবং সেটিকে অপসারণের জন্য এর আগে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কউক) থেকে তিন দফায় চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। কউক চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জসিম উদ্দিন জানান, যেকোনো স্থাপনা নির্মাণে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক হলেও কক্সবাজারের অধিকাংশ হোটেল-রিসোর্টই তা তোয়াক্কা না করে গড়ে উঠেছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুতই অবৈধ স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি চলছে। এদিকে ফায়ার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, আনুমানিক ছয় শতাধিক হোটেল-রিসোর্টের মধ্যে মাত্র দেড় শর মতো প্রতিষ্ঠানের ফায়ার লাইসেন্স রয়েছে। বাঁশ ও কাঠের তৈরি অতি দাহ্য এই রিসোর্টগুলোতে জরুরি নির্গমন পথ বা ইমার্জেন্সি এক্সিটেরও চরম সংকট রয়েছে।
কক্সবাজারের মেরিন ড্রাইভ সংলগ্ন এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার দুই পাশে যত্রতত্র গড়ে উঠেছে শত শত রেস্তোরাঁ ও রিসোর্ট, যার বেশিরভাগই ফায়ার সেফটি বা আইনি বিধিমালা ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে। কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান অননুমোদিত রিসোর্ট গড়ে ওঠার কথা স্বীকার করে জানান, সমিতির নিবন্ধিত আড়াই শ হোটেলের বাইরেও প্রায় ৪০ থেকে ৫০টি অবৈধ রিসোর্ট রয়েছে। ডলফিন মোড় থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত ফায়ার স্টেশনের অনুপস্থিতির কারণে গত অগ্নিকাণ্ডের সময় ফায়ার সার্ভিসকে সুদূর ২২ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হয়, যার ফলে ক্ষয়ক্ষতি ও প্রাণহানির মাত্রা বহুগুণ বেড়ে যায়। স্থানীয় বাসিন্দা ও সচেতন পর্যটকরা অবিলম্বে মেরিন ড্রাইভে একটি স্থায়ী ফায়ার স্টেশন স্থাপনের জোরালো দাবি জানিয়েছেন।
হোটেল-রিসোর্টের পাশাপাশি সৈকত এলাকার অনিয়ন্ত্রিত বিনোদনব্যবস্থা ও বিভিন্ন রাইড পরিচালনার ক্ষেত্রেও চরম নৈরাজ্যের অভিযোগ রয়েছে। বিচ বাইক, ঘোড়া কিংবা জেট স্কির মতো রাইডগুলো সুনির্দিষ্ট নীতিমালা ও নির্ধারিত দরদাম ছাড়াই পরিচালিত হওয়ায় পর্যটকরা প্রতিনিয়ত হয়রানি ও ঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছেন। ঢাকা থেকে সপরিবারে বেড়াতে আসা পর্যটক আইরিন আক্তার ও হাবিবুর রহমান দম্পতি বলেন, কর্তৃপক্ষের গাফিলতি ও তদারকির অভাবেই আজ এমন বড় ধরনের প্রাণহানি ঘটছে। তাঁরা পর্যটকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
সার্বিক বিষয়ে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান জানান, পর্যটন মৌসুমকে সামনে রেখে পর্যটকদের সেবা মানসম্মত করা এবং অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা এড়াতে হোটেল-রিসোর্ট মালিকদের সঙ্গে অতিসত্বর জরুরি বৈঠকে বসবে জেলা প্রশাসন। পর্যটকদের জানমালের নিরাপত্তা বিধান এবং অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট ও বিশেষ অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে জানান তিনি।